Skip to content

অবরোধ-বাসিনী

July 2, 2018

বেগম রোকেয়ার অবরোধ-বাসিনী থেকে দুয়েকটি অবরোধবাসিনী থাকুক এখানে।

পশ্চিম দেশের এক হিন্দু বধূ তাহার শাশুড়ি ও স্বামীর সহিত গঙ্গাস্নানে গিয়াছিল। স্নান শেষ করিয়া ফিরিবার সময় তাহার শাশুড়ি ও স্বামীকে ভিড়ের মধ্যে দেখিতে পাইল না। অবশেষে সে এক ভদ্রলোকের পিছু পিছু চলিল। কতক্ষণ পরে পুলিশের হল্লা।―সেই ভদ্রলোককে ধরিয়া কনস্টেবল বলে, ‘‘তুমি অমুকের বউ ভাগাইয়া লইয়া যাইতেছ।’’ তিনি আচম্বিতে ফিরিয়া দেখেন, আরে! এ কাহার বউ পিছন হইতে তাঁহার কাছার খুঁটি ধরিয়া আসিতেছে। প্রশ্ন করায় বধূ বলিল, সে সর্বক্ষণ মাথায় ঘোমটা দিয়া থাকে ― নিজের স্বামীকে সে কখনও ভাল করিয়া দেখে নাই। স্বামীর পরিধানে হলদে পাড়ের ধুতি ছিল, তাহাই সে দেখিয়াছে। এই ভদ্রলোকের ধুতির পাড় হলদে দেখিয়া সে তাঁহার সঙ্গ লইয়াছে।

শিয়ালদহ স্টেশনের প্লাটফরমে ভরা সন্ধ্যার সময় এক ভদ্রলোক ট্রেনের অপেক্ষায় পায়চারি করিতেছিলেন। কিছু দূরে আর একজন ভদ্রলোক দাঁড়াইয়া ছিলেন; তাহার পার্শ্বে এক গাদা বিছানা ইত্যাদি ছিল। পূর্বোক্ত ভদ্রলোক কিঞ্চিৎ ক্লান্তি বোধ করায় উক্ত গাদার উপর বসিতে গেলেন। তিনি বসিবা মাত্র বিছানা নড়িয়া উঠিল ― তিনি তৎক্ষনাৎ সভয়ে লাফাইয়া উঠিলেন। এমন সময়ে সেই দণ্ডায়মান ভদ্রলোক দৌড়িয়া আসিয়া সক্রোধে বলিলেন, ― ‘‘ মশায়, করেন কি? আপনি স্ত্রীলোকদের মাথার উপর বসিতে গেলেন কেন?’’ বেচারা হতভম্ব হইয়া বলিলেন, ‘‘মাফ করিবেন মশায়! সন্ধ্যার আঁধারে ভালমতে দেখিতে পাই নাই, তাই বিছানার গাদা মনে করিয়া বসিয়াছিলাম। বিছানা নড়িয়া উঠায় আমি ভয় পাইয়াছিলাম যে, এ কি ব্যাপার!’’

বেহার অঞ্চলে নারীক ঘরানার মহিলাগণ সচরাচর রেলপথে ভ্রমণের পথে ট্রেনে উঠেন না। তাঁহাদিগকে বনাতের পর্দা ঢাকা পালকিতে পুরিয়া, সেই পালকি ট্রেনের মালগাড়িতে তুলিয়া দেওয়া হয়। ফল কথা, বিবিরা পথের দৃশ্য কিছুই দেখিতে পান না। তাঁহারা ব্রুকবণ্ড চায়ের মত Vacuum টিনে প্যাক হইয়া দেশ ভ্রমণ করেন। কিন্তু এই কলিকাতার এক ঘর সম্ভ্রান্ত পরিবার উহার উপরও টেক্কা দিয়াছেন। তাঁহাদের বাড়ির বিবিদের রেলপথে কোথাও যাইতে হইলে প্রথমে তাঁহাদের প্রত্যেককে, পালকি বিছানা পাতিয়া, একটা তালপাতার হাতপাখা, এক কুজা পানি এবং একটা গ্লাসসহ বন্ধ করা হয়। পরে সেই পালকিগুলি তাঁহাদের পিতা কিম্বা পুত্রের সম্মুখে চাকরেরা যথাক্রমে―(১) বনাতের পর্দা দ্বারা প্যাক করে; (২) তাহার উপর মোম-জমা কাপড় দ্বারা সেলাই করে; (৩) তাহার উপর খারুয়ার কাপড়ে ঘিরিয়া সেলাই করে; (৪) তাহার উপর মুম্বাই চাদরের দ্বারা সেলাই করে; (৫) অতঃপর সর্বোপরে চট মোড়াই করিয়া সেলাই করে। এই সেলাই ব্যাপার তিন চারি ঘণ্টা ব্যাপিয়া হয়― আর সেই চারি ঘণ্টা পর্যন্ত বাড়ির কর্তা ঠায় উপস্থিত থাকিয়া খাড়া পাহারা দেন। পরে বেহারা ডাকিয়া পালকিগুলি ট্রেনের ব্রেকভ্যানে তুলিয়া দেওয়া হয়। অতঃপর গন্তব্য স্থানে পৌঁছিবার পর, পুনরায় পুরুষ অভিভাবকের সম্মুখে ক্রমান্বয়ে পালকিগুলির সেলাই খোলা হয়। সেলাই খুলিয়া পালকিগুলি বনাতের পর্দা ঢাকা অবস্থায় রাখিয়া চাকরেরা সরিয়া যায়। পরে কর্তা স্বয়ং এবং বাড়ির অপর আত্মীয় ও মেয়েমানুষেরা আসিয়া পালকির কপাট খুলিয়া মুমূর্ষা বন্দিনীদের অজ্ঞান অবস্থায় বাহির করিয়া যথারীতি মাথায় গোলাপজল ও বরফ দিয়া, মুখে চামচ দিয়া পানি দিয়া, চোখে মুখে পানির ছিটা দিয়া বাতাস করিতে থাকেন। দুই ঘণ্টা বা ততোধিক সময়ের শুশ্রূষার পর বিবিরা সুস্থ হন।

2 Comments
  1. Reblogged this on surajit793.

  2. খুবই মজা পেলাম

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: