Skip to content

মুক্তিরসংগ্রামএবারেরসংগ্রামস্বাধীনতারসংগ্রাম

March 9, 2017

৭ই মার্চের ভাষণ
৭ মার্চ ২০০৯

২০০৭, ২০০৮ ও ২০০৯, এই তিন বছর আমি রাস্তায় ৭ই মার্চের ভাষণ বাজাতে শুনিনি। ২০০৭ ও ২০০৮ বুঝলাম, কিন্তু কেন ২০০৯-এ ও শুনলাম না, বুঝতে পারছি না। রাস্তায় কি আর কখনো ৭ই মার্চের ভাষণ বাজবে না? এমন স্বতঃস্ফূর্ত তুঙ্গ ভাষণ, বাংলা ভাষার সে কী জোর, বাংলাদেশের সে কী অভ্যুত্থান, সে কী দীপ্ত ঘোষণা স্বাধীনতার। বাংলাদেশের বাঙালী যদি এ ভাষণ না শোনে, তার যেমন বাংলা জানা সম্পন্ন হবে না, তেমনি শুরুই হবে না বাংলাদেশকে ভালোবাসা। আমি এখানে পুরো ভাষণটি টাইপ করছি, যদিও আমার টাইপ স্পিড এক কচ্ছপ চলা। আর আমার একটি অনুরোধ আছে, কেউ যদি পুরো ভাষণটির (না পাওয়া গেলে আংশিক) অডিও তুলে দিতে পারতেন সাইটে খুব ভালো হতো।

আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সকলে জানেন এবং বোঝেন আমরা জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ অধিকার চায়। কী অন্যায় করেছিলাম?

নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে ও আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল এসেম্বলি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈরী করব এবং এদেশের ইতিহাসকে গড়ে তুলব। এদেশের মানুষ অর্থনীতিক, রাজনীতিক ও সাংষ্কৃতিক মুক্তি পাবেন। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলছি বাংলাদেশের করুণ ইতিহাস, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। এই রক্তের ইতিহাস মুমূর্ষু মানুষের করুণ আর্তনাদ—এদেশের ইতিহাস, এদেশের মানুষের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।

১৯৫২ সালে আমরা রক্ত দিয়েছি।১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারিনি। ১৯৫৮ সালে আয়ুব খাঁ মার্শাল-ল জারি করে ১০ বছর আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৯ সালের আন্দোলনে আয়ুব খাঁর পতনের পরে ইয়াহিয়া এলেন। ইয়াহিয়া খান সাহেব বললেন দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন— আমরা মেনে নিলাম। তারপর অনেক ইতিহাস হয়ে গেল, নির্বাচন হলো। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে তাঁকে অনুরোধ করেছিলাম, ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আমাদের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দিন। তিনি আমার কথা রাখলেন না। রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। তিনি বললেন, মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে সভা হবে। আমি বললাম, এসেম্বলির মধ্যে আলোচনা করব— এমনকি এও পর্যন্ত বললাম, যদি ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজনের মতেও যদি তা ন্যায্য কথা হয়, আমরা মেনে নেব।

ভুট্টো সাহেব এখানে ঢাকায় এসেছিলেন আলোচনা করলেন। বলে গেলেন, আলোচনার দরজা বন্ধ নয়, আরো আলোচনা হবে। তারপর অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে আমরা আলোচনা করলাম— আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈরী করব। সবাই আসুন, বসুন। আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈরী করব। তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বাররা যদি আসে তাহলে কসাইখানা হবে এসেম্বলি। তিনি বললেন, যারা যাবে, তাদের মেরে ফেলে দেওয়া হবে। আর যদি কেউ এসেম্বলিতে আসে পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত সব জোর করে বন্ধ করা হবে। আমি বললাম, এসেম্বলি চলবে। আর হঠাৎ মার্চের ১লা তারিখে এসেম্বলি বন্ধ করে দেওয়া হলো।

ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট হিসেবে এসেম্বলি ডেকেছিলেন। আমি বললাম, যাবো। ভুট্টো বললেন, যাবেন না। ৩৫ জন সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এলেন। তারপর হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া, দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষের, দোষ দেওয়া হলো আমাকে। দেশের মানুষ প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠলো।

আমি বললাম, শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালন করুন। আমি বললাম, আপনারা কলকারখানা সব কিছু বন্ধ করে দেন। জনগণ সাড়া দিল। আপন ইচ্ছায় জনগণ রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো। সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। আমি বললাম, আমরা জামা কেনার পয়সা দিয়ে অস্ত্র পেয়েছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য। আজ সেই অস্ত্র দেশের গরিব-দুঃখী মানুষের বিরুদ্ধে— তার বুকের ওপর হচ্ছে গুলি। আমরা পাকিস্তানে সংখ্যাগুরু— আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই তারা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

আমি বলেছিলাম জেনারেল ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। দেখে যান কিভাবে আমার গরিবের ওপর, আমার বাংলার মানুষের বুকের ওপর গুলি করা হয়েছে। কিভাবে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে। কী করে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। আপনি আসুন, আপনি দেখুন। তিনি বললেন, আমি ১০ তারিখে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স ডাকব।

আমি বলেছি কীসের এসেম্বলি বসবে? কার সঙ্গে কথা বলব? আপনারা যারা আমার মানুষের রক্ত নিয়েছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলব? পাঁচ ঘন্টা গোপন বৈঠকে সমস্ত দোষ তারা আমাদের বাংলার মানুষের ওপর দিয়েছেন, দায়ী আমরা।

২৫ তারিখে এসেম্বলি ডেকেছেন। রক্তের দাগ শুকায় নাই। ১০ তারিখে বলেছি, রক্তে পাড়া দিয়ে, শহীদের ওপর পাড়া দিয়ে, এসেম্বলি খোলা চলবে না। সামরিক আইন মার্শাল-ল উইথড্র করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ঢুকতে হবে। যে ভাইদের হত্যা করা হয়েছে, তার তদন্ত করতে হবে। আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখব আমরা এসেম্বলিতে বসতে পারব কিনা। এর পূর্বে এসেম্বলিতে আমরা বসতে পারি না।

আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। দেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশ কোর্ট-কাচারি, আদালত, ফৌজদারি আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরিবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে, সেজন্য যে সমস্ত জিনিসগুলি আছে, সেগুলির হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিকশা, গরুর গাড়ি, রেল চলবে। শুধু সেক্রেটারিয়েট ও সুপ্রিম কোর্ট, হাই কোর্ট, জজ কোর্ট, সেমি-গভর্নমেন্ট দপ্তর, ওয়াপদা— কোনো কিছুই চলবে না। ২৮ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন। এরপর যদি বেতন দেয়া না হয়, এরপর যদি একটি গুলি চলে, এরপর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়— তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব। সৈন্যরা, তোমরা আমাদের ভাই। তোমরা ব্যারাকে থাকো, তোমাদের কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু আর তোমরা গুলি করবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না।

আর যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে, আমরা আওয়ামী লীগ থেকে যদ্দুর পারি সাহায্য করতে চেষ্টা করব। যারা পারেন আওয়ামী লীগ অফিসে সামান্য টাকা-পয়সা পৌঁছে দেবেন। আর সাতদিন হরতালে শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছে, প্রত্যেক শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছে দেবেন। সরকারি কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হচ্ছে ততদিন ওয়াপদার ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো— কেউ দেবে না। শুনুন, মনে রাখুন। শত্রু পেছনে ঢুকেছে আমাদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান যারা আছে আমাদের ভাই— বাঙালি অবাঙালি তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের ওপর। আমাদের যেন বদনাম না হয়।

মনে রাখবেন, রেডিও যদি আমাদের কথা না শোনে, তাহলে কোনো বাঙালি রেডিও স্টেশনে যাবে না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, তাহলে কর্মচারীরা টেলিভিশনে যাবেন না। দুঘন্টা ব্যাংক খোলা থাকবে, যাতে মানুষ তাদের মায়নাপত্র নিতে পারে। পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন, টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ব বাংলায় চলবে এবং বাংলাদেশের নিউজ বাইরে পাঠানো চলবে।

এই দেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা চলছে— বাঙালিরা বুঝেসুঝে কাজ করবে। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলুন এবং আমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা

সংযোজন: মন্তব্য ও অন্যান্য লিন্ক

২১ মার্চ ২০০৯

সম্প্রতি এক সভায় আমাদের শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা করেছেন বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ্যপুস্তকে অর্ন্তভুক্ত হবে। আমরা অপেক্ষা করছি আগামী বছরের পাঠ্যপুস্তকের জন্য। কিন্তু মন্তব্যটা লিখছি অন্য কারণে। আজকাল আমরা তারিখ লিখি ৩ এপ্রিল ২০০৯, এটা খুবই ভাল পদ্ধতি; কিন্তু পত্রিকাগুলো যখন ‘৭ মার্চের ভাষণ’ লেখেন তা কিন্তু পড়তে বা শুনতে ভাল লাগে না। ৭ মার্চ ২০০৯ লিখুন, কিন্তু লিখুন ‘৭ই মার্চের ভাষণ’, ২৬শে মার্চ, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ১লা বৈশাখ, ১লা মে, ১৪ই ডিসেম্বর, ১৬ই ডিসেম্বর। এক্ষেত্রে এগুলো তারিখ হিসেবে না দেখে বিশেষায়িত বিশেষ্য হিসেবে দেখুন। আশা করি আমাদের পাঠ্যপুস্তকে লেখা হবে ‘৭ই মার্চের ভাষণ’, আর আমাদের পত্রিকাগুলোও ব্যাপারটা খেয়াল রাখবেন। আমরা কেউই পড়তে চাই না ২১ ফেব্রুয়ারি, আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারি, আমরা এভাবে দিনটাকে চিনি বহুদিন থেকে, এ আমরা ভুলতে চাই না, ভুলতে পারি না। – মাসুদ করিম

২৩ মার্চ ২০০৯

আগের মতো “৭ই মার্চ” না লিখে এখন অনেকসময়ে লেখা হয় “৭ মার্চ”; কিংবা “৩রা জুন” বা “৪ঠা নভেম্বর”-এর বদলে এখন আমরা লিখি “৩ জুন” বা “৪ নভেম্বর”। কিন্তু পড়ার ক্ষেত্রে এখনো আগের মতোই সাতই, তেসরা বা চৌঠা-ই উচ্চারণ করতে হবে। সেটাই নিয়ম। ফলে খাতায়/পত্রিকায় “২১ ফেব্রুয়ারি” লিখলেও আমরা মুখে “একুশ ফেব্রুয়ারি” বলব না, বলব “একুশে ফেব্রুয়ারি”।

আর কেউ যদি তারিখের ক্ষেত্রে এখনো আগের মতো ১লা, ৩রা বা ৮ই লিখতে চান, তাতেও কোনো বাধা নেই। কিন্তু এরকম মনে করার কোনো কারণ নেই যে “২ জুলাই” লিখলে মুখেও বলতে হবে “দুই জুলাই”; বরং “২” বা “২রা” যা-ই লিখি না কেন, অবশ্যই উচ্চারণ করতে হবে “দোসরা”; কারণ “দোসরা”-র বিকল্প কখনোই “দুই” নয়।

আজকাল অনেকেই এটা খেয়াল করেন না। অনেক সংবাদ-পাঠককেও এই ভুলটা করতে দেখি। ভুলটা ছোট, কিন্তু মারাত্মক। খুবই শ্রুতিকটু। এ ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।- রেজাউল করিম সুমন

৮ মার্চ ২০১১

সেই ভাষণের পূর্ণ পাঠ
রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব

ভাইয়েরা আমার, আজ দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন, আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।
কী অন্যায় করেছিলাম? নির্বাচনের পরে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে, আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈরি করব এবং এ দেশকে আমরা গড়ে তুলব। এ দেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, ২৩ বছরের করুণ ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। ২৩ বছরের ইতিহাস মুমূর্ষু নরনারীর আর্তনাদের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস এ দেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।
১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছি, ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল জারি করে দশ বছর পর্যন্ত আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনে, ৭ জুন আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬৯ সালের আন্দোলনে আইয়ুব খানের পতন হওয়ার পরে যখন ইয়াহিয়া খান সাহেব সরকারের দায়িত্বভার নিলেন, তিনি বললেন, দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন, গণতন্ত্র দেবেন; আমরা মেনে নিলাম। তারপর অনেক ইতিহাস হয়ে গেল, নির্বাচন হলো। আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি, শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসেবে তাকে অনুরোধ করলাম, ১৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। তিনি বললেন, প্রথম সপ্তাহে, মার্চ মাসে (সভা) হবে। আমরা বললাম, ঠিক আছে, আমরা অ্যাসেম্বলিতে বসব। আমি বললাম, অ্যাসেম্বলির মধ্যে আলোচনা করব। এমনকি আমি এ পর্যন্ত বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজন যদিও সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।
ভুট্টো সাহেব এখানে এসেছিলেন, আলোচনা করলেন। বলে গেলেন যে, আলোচনার দরজা বন্ধ নয়, আরো আলোচনা হবে। তারপরে অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপ করলাম_আপনারা আসুন, বসুন, আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করি। তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বাররা যদি এখানে আসে তাহলে কসাইখানা হবে অ্যাসেম্বলি। তিনি বললেন, যে যাবে তাকে মেরে ফেলে দেওয়া হবে। যদি কেউ অ্যাসেম্বলিতে আসে তাহলে পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত দোকান জোর করে বন্ধ করা হবে। আমি বললাম অ্যাসেম্বলি চলবে। তারপর হঠাৎ ১ তারিখে অ্যাসেম্বলি বন্ধ করে দেওয়া হলো।
ইয়াহিয়া খান সাহেব প্রেসিডেন্ট হিসেবে অ্যাসেম্বলি ডেকেছিলেন, আমি বললাম যে, আমি যাব। ভুট্টো সাহেব বললেন, তিনি যাবেন না। পঁয়ত্রিশ জন সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানে আসলেন। তারপরে হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হলো। দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে। বন্ধ করে দেওয়ার পর এ দেশের মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠল।
আমি বললাম, শান্তিপূর্ণভাবে আপনারা হরতাল পালন করেন। আমি বললাম, আপনারা কলকারখানা সবকিছু বন্ধ করে দেন। জনগণ সাড়া দিল। আপন ইচ্ছায় জনগণ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য স্থির প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো।
কী পেলাম আমরা? যে আমরা পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরিব-দুঃখী-নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে। তার বুকের ওপর হচ্ছে গুলি। আমরা পাকিস্তানে সংখ্যাগুরু, আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি, তখনই তারা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
টেলিফোনে আমার সঙ্গে তার কথা হয়। তাঁকে আমি বলেছিলাম, জেনারেল ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কিভাবে আমার গরিবের ওপর, আমার বাংলার মানুষের বুকের ওপর গুলি করা হয়েছে, কী করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে, কী করে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন। তিনি বললেন, আমি নাকি স্বীকার করেছি, ১০ তারিখে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স হবে।
আমি তো অনেক আগেই বলেছি, কিসের আরটিসি? কার সঙ্গে বসব? যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে, তাদের সঙ্গে বসব? হঠাৎ আমার সঙ্গে পরামর্শ না করে পাঁচ ঘণ্টা গোপনে বৈঠক করে যে বক্তৃতা তিনি করেছেন, সমস্ত দোষ তিনি আমার ওপরে দিয়েছেন। বাংলার মানুষের ওপর দিয়েছেন।
ভাইয়েরা আমার! ২৫ তারিখে অ্যাসেম্বলি কল করেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। আমি ১০ তারিখে বলে দিয়েছি যে, ওই শহীদের রক্তের ওপর পাড়া দিয়ে আরটিসিতে কিছুতেই মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না। অ্যাসেম্বলি কল করেছে, আমার দাবি মানতে হবে প্রথম। সামরিক আইন, মার্শাল ল উইথড্র করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত নিতে হবে। যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে। আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তার পরই বিবেচনা করে দেখব আমরা অ্যাসেম্বলিতে বসতে পারব কি পারব না। এর আগে অ্যাসেম্বলিতে বসতে আমরা পারি না।
আমি, আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট, কাছারি, আদালত, ফৌজদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরিবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে, সে জন্য সমস্ত অন্যান্য জিনিসগুলো আছে, সেগুলোর হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিকশা, ঘোড়ার গাড়ি চলবে, রেল চলবে, লঞ্চ চলবে। শুধু, সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি-গভর্নমেন্ট দপ্তরগুলো_ওয়াপদা, কোনো কিছু চলবে না। ২৮ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন। এর পরে যদি বেতন দেওয়া না হয়, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়_তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু_আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারব। আমরা পানিতে মারব।
তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না।
কিন্তু আর আমার বুকের ওপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না।
আর যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আমরা আওয়ামী লীগ থেকে যত দূর পারি তাদের সাহায্য করতে চেষ্টা করব। যাঁরা পারেন আমার রিলিফ কমিটিতে সামান্য টাকা-পয়সা পেঁৗছিয়ে দেবেন। আর এই সাত দিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইরা যোগদান করেছেন প্রত্যেককে শিল্পের মালিক তাঁদের বেতন পেঁৗছাইয়া দেবেন।
সরকারি কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এ দেশের মুক্তি না হবে, খাজনা, ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো, কেউ দেবেন না। শোনেন_মনে রাখবেন শত্রু বাহিনী ঢুকেছে। নিজেদের মধ্যে আত্দকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু মুসলমান, বাঙালি নন-বাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের ওপরে, আমাদের যেন বদনাম না হয়। মনে রাখবেন, রেডিও-টেলিভিশনের কর্মচারীরা, যদি রেডিওতে আমাদের কথা না শোনে, তাহলে কোনো বাঙালি রেডিও স্টেশনে যাবেন না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, কোনো বাঙালি টেলিভিশনে যাবেন না। দুই ঘণ্টা ব্যাংক খোলা থাকবে, যাতে মানুষ তাদের মাইনাপত্র নেবার পারে। কিন্তু পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন, টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ব বাংলায় চলবে এবং বিদেশের সঙ্গে নিউজ পাঠাতে হলে আপনারা চালাবেন।
কিন্তু যদি এ দেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা করা হয়, বাঙালিরা বুঝেসুঝে কাজ করবেন। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলো এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।
জয় বাংলা।

৭ মার্চ ২০১১

২৬ মার্চে দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে আছেন ঘোষক জিয়া, ১৫ আগস্টে জন্মদিন পালন করেন খালেদা, গত আর্মি সমর্থিত সরকার ৭ মার্চ তারেক জিয়াকে আটক করে এইদিনটিও তুলে দিয়েছেন বিএনপির হাতে। – মাসুদ করিম

৮ মার্চ ২০১১

আমি যে পাঠটি আমার পোস্টে দিয়েছি সেটি এম আর আখতার মুকুলের আমি বিজয় দেখেছি থেকে নেয়া। মন্তব্য ৩.২এ যে পাঠটি সেটি বিনয় ভূষণ ধরের আগের কালের কণ্ঠের লিন্ক থেকে নিয়ে ব্লক-কোট করে দিয়েছি যেন লিন্ক হারিয়ে গেলেও আমরা পূর্ণ ভাষণটি দেখতে পাই। অনেক দিন ধরে যে অডিও-ভিডিও এই পোস্টে ছিল না ইউটিউবের ভিডিও লিন্কটি দিয়ে সেঅভাব পূরণ করেছেন সরব দর্শক। একটা রেডিও ভার্সানও আছে স্বভাবতই সেটি শুধু অডিও, সেটি এখনো এখানে যুক্ত হয়নি। কিন্তু যেটি লক্ষণীয় সেটি হচ্ছে ভার্সানগুলোতে অমিল আছে। ইউটিউবের ভিডিওটি ১০মিনিটের এবং ভাষণটি শেষ পর্যন্ত নেই। এখানে আছে প্রায় ১৪ মিনিটের একটা ভিডিও কিন্তু এই ভিডিওতে কিছু পুনরাবৃত্তি আছে। কালের কন্ঠে পূর্ণপাঠ ও পোস্টে দেয়া পূর্ণপাঠে ভাষাগত বিভিন্ন অমিল চোখে পড়ে। আবার অডিও-ভিডিও নিয়ে শোনা যায় ১৮মিনিট/১৯মিনিট এবং আমরা এখানে ইউটিউবে যেটা পাচ্ছি সেটি ১০ মিনিট। তার মানে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষণের সংরক্ষণে আমাদের অবহেলা ধরা পড়ছে। এনিয়ে আজকের জনকণ্ঠে মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী লিখছেন : অবহেলায় এখনও ইতিহাসের কালজয়ী ভাষণটি। নিচে পুরো লেখাটিই এখানে কোট করছি।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ভাষণটি সকল বিবেচনায় একটি অনবদ্য, অসাধারণ, অতুলনীয় রাজনৈতিক ভাষণ বলে সকল বিবেকবান মানুষই এক বাক্যে আখ্যায়িত করে থাকেন। এই ভাষণের গুরুত্ব আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরে আলোচিত হতে থাকবে। কেননা এই ভাষণই বাংলাদেশের জনগণকে স্বাধীনতার পথনির্দেশনা দিয়েছিল, করণীয় নির্ধারণ করে দিয়েছিল। এই ভাষণের পর ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরুর আগে বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পেরেছিলেন কি পারেননি_সেই বিতর্ক ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একেবারেই দেখা দেয়নি, ১৯৭২ সালের পরও বেশ ক’বছর দেশে কেউ করেনি। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এই ভাষণে বঙ্গবন্ধুর স্বকণ্ঠে উচ্চারিত ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ অংশটুকু প্রতিদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বজ্রকণ্ঠ নামে প্রচারিত হতো। এর পরও যারা বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি বলে প্রচার করে থাকে তাদের ‘মনে শুভবুদ্ধির উদয় হোক’ কথাটির বেশি কিছু প্রার্থনা করার নেই।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুধু একটি বক্তৃতাই নয়, এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য কালজয়ী দলিলও। এই ভাষণ শোনার পর থেকেই ১৯৭১ সালে সমগ্র জাতি পাকিসত্মান রাষ্ট্র ব্যবস্থা ত্যাগ করে মানসিকভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। একটি ভাষণ যখন গোটা জাতিকে এমনভাবে আন্দোলিত, আলোড়িত, উজ্জীবিত এবং রাজনৈতিকভাবে সশস্ত্র করতে পারে তখন সহজেই অনুমেয় সেই ভাষণের ভেতরের শক্তি কত অসীম হতে পারে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি আসলেই তেমন এক অসীম প্রভাব, তাৎপর্য ও শক্তি জাগানিয়া ভাষণ_এ নিয়ে কোন সন্দেহ করার অবকাশ নেই। কেননা, এই ভাষণে বর্ণিত বার্তা, করণীয় ও দিকনির্দেশনাই গোটা জাতি অৰরে অৰরে পালন করেছে, এর ফলও তাই পেয়েছে অর্থাৎ স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণ অবিচ্ছেদ্য অংশ, এই ভাষণই বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতা লাভের স্বপ্ন ও বাস্তবতাকে রাজনৈতিকভাবে ধারণ করে আছে। আমরা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে আমাদের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের এক ঐতিহাসিক ভাষণ হিসেবেই সম্বোধন করে থাকি। এসব সম্বোধনে কোন অতিরঞ্জন নেই। অথচ এই ভাষণটির দেহগত অবস্থান কী, বর্তমানে তা কেমন আছে আমাদের সে সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা নেই। আওয়ামী লীগ যখন ৰমতায় থাকে তখন দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগ এবং সরকার বিভিন্ন আলোচনাসভার আয়োজন করে থাকে। বিএনপি যখন ৰমতায় থাকে তখন মুক্তিযুদ্ধের সমগ্র ইতিহাসটাই দখল করার চেষ্টা পরিলৰিত হয়। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণের তাৎপর্যও তখন অন্য কিছু হয়ে যায়। বলার চেষ্টা করা হয় যে, শেখ মুজিব পাকিসত্মান রৰা করতে ৪টি শর্ত দিয়েছিলেন এই ভাষণে, পাঠ্যপুস্তকে সেই ৪ শর্তই লেখা হয়ে থাকে। আসলে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটিকে মস্নান করে দেয়ার জন্যই ইয়াহিয়াকে দেয়া বঙ্গবন্ধুর ৪ শর্ত উপস্থাপন করা হয়। অথচ বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের প্রধান বক্তব্যই হচ্ছে_’এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ভাষণের এমন গুরম্নত্বপূর্ণ অংশকে গৌণ করে দিয়ে চারটি শর্তের ওপর গুরম্নত্ব দেয়ার অর্থ হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের বোঝানোর চেষ্টা করা যে, শেখ মুজিব একদিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা বলেছিলেন, অন্যদিকে ৪ দফা দিয়ে পাকিসত্মান রৰার জন্য সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চেয়েছিলেন। ১৬ মার্চ থেকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসার সূত্র হচ্ছে ৭ মার্চের ভাষণে উচ্চারিত ৪ দফা।
মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগ বিরোধী সকল দলই মুক্তিযুদ্ধে তাদের দল ও নেতাদের ভূমিকাকে বড় করে দেখানোর জন্য পাঠ্যপুসত্মকে ইতিহাস বিকৃতি ঘটিয়েছে। বিএনপি যখনই ৰমতায় আসে তখনই দলটি পাঠ্যপুসত্মকে মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানকে বড় করে তুলে ধরার জন্য বঙ্গবন্ধুর সকল ভূমিকাকে মস্নান করে দেওয়ার জন্যই ইতিহাস বিকৃতি ঘটিয়ে থাকে। সামরিক শাসক এরশাদের শাসনামলেও মুক্তিযুদ্ধে এরশাদের অবদান খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছিল। ৪ দলীয় জোট ২০০১-২০০৬ সালে ৰমতায় থাকার সময় জামায়াত-ছাত্রসংঘের বাংলাদেশবিরোধী কর্মকা-, বুদ্ধিজীবী হত্যা ইত্যাদি বাদ দিয়েছিল, জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতা হিসেবে নানাভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। এর মাধ্যমে মুছে দেয়া হয়েছিল বঙ্গবন্ধুসহ ১৯৭১ সালের মূল রাজনৈতিক নেতৃত্বের নাম এবং তাদের ভূমিকা। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে টানা-হেঁচড়া দখলবাজি, গলাবাজি, বিকৃতির রাজনীতি দেশে চলছে।
এভাবে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে যা খুশি তা করতে পারা সম্ভব হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিকভাবে লেখা, এর তথ্য-উপাত্ত যথার্থভাবে লিপিবদ্ধকরণ করা হয়নি বলে। আমরা হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদিত ১৬ খ-ের দলিলপত্রকেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলে ধরে নিচ্ছি। একবারও দেখছি না যেসব দলিলপত্র ওই ১৬ খ-ে সনি্নবেশিত হয়েছে সেগুলো যথাযথভাবে করা হয়েছে কি না। অনেক ভাল কাজ ওই সম্পাদনা পরিষদ তখন তারা করেছেন। কিন্তু একটি কথা মনে রাখতে হবে, যেই সময়ে ওই বিশাল কাজটি তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা, সংরৰণ, দলিলপত্র অবিকৃতভাবে উপস্থাপনের যথেষ্ট অনুকূল সময় ছিল না। যারা কাজটি করেছিলেন তারা যথেষ্ট সময় দিতে পারেননি, তাদের নানা সমস্যা এবং অভাব ছিল, অভিজ্ঞতারও যথেষ্ট অভাব ছিল। সে কারণেই কিছু কিছু তথ্য যথাযথভাবে সংগৃহীত হয়নি। সেটি স্পষ্টই চোখে ধরা পড়ে। ধরম্নন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি মুদ্রিত করার বিষয়টি। ওই দলিলপত্রের তৃতীয় খ-ে এতে মুদ্রিত হয়েছে (৭০০-৭০২ পৃষ্ঠা)। মনে হচ্ছে ভাষণটিকে স্রেফ কোন একটি ক্যাসেট থেকে কেউ একজন শুনে তুলে দিয়েছেন_তেমনভাবেই কাজটি সম্পন্ন হয়েছে তবে সম্পাদনা হয়নি। যে ভাষণের ঐতিহাসিক গুরম্নত্ব এতবেশি তা এতোটা দায়সারাভাবে মুদ্রণ করার কোন সুযোগ আসলে নেই। এটি রাষ্ট্রীয় গুরম্নত্বে দেখার বিষয় ছিল। এ ভাষণটি মুদ্রণের জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি অবশ্যই করা উচিত ছিল। কিন্তু সম্পাদনা পরিষদ তা করেননি বলেই মনে হয়। যে সময়ে কাজটি হয়েছিল তখন রাষ্ট্র ৰমতায় যে সরকার ছিল তারা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে বিশেষ মর্যাদায় মুদ্রণের ৰেত্রে সহযোগিতা করবে তা আশা করা সম্ভব ছিল কি না তাই হয়ত সম্পাদনা পরিষদ ভেবে কূল পায়নি। তারা তখন এই ভাষণটিও অন্য আর দশটি বক্তৃতার মতো লিখে দিতে পারাটাকেই গুরম্নত্বপূর্ণ মনে করেছিল। ফলে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি ওই খ-ে যেভাবে মুদ্রিত হয়েছে তা যে সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি সেটি এখন অনেকের কাছেই স্পষ্ট হওয়ার কথা। কেন ভাষণটি যথাযথ হয়নি বলে আমি মনে করি তার একটি ব্যাখ্যা আমার রয়েছে। সেটি আমি গত বছর দৈনিক কালের কণ্ঠে ৭ মার্চের লেখায় এবং ২০০৯ সালে ১ জুলাই ভোরের কাগজে প্রকাশিত লেখাতেও তুলে ধরেছিলাম। আমি আশা করেছিলাম বর্তমানে যেহেতু আওয়ামী লীগ সরকার ৰমতায় আছে, তারা হয়ত বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটির এমন বেহাল অবস্থা থেকে উদ্ধারের উদ্যোগ নেবে। কিন্তু দুই বছরই এ ৰেত্রে সরকারকে নীরব থাকতে দেখে মনে হচ্ছে, সরকারের কোন গুরম্নত্বপূর্ণ ব্যক্তিই হয়ত আমার লেখাটি দেখেননি বা পড়েননি। সে কারণে এবারও আবার লিখছি। দয়া করে আগের দু’টো লেখাসহ এ লেখাটিতে উত্থাপিত বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখুন, সিদ্ধানত্ম নিন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি কেউ বলছেন ১৮ মিনিটের, কেউ বলছেন ১৯ মিনিটের। তবে বিটিভিতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের যে ভিডিওটি রয়েছে তা মাত্র ১০ মিনিটের, অন্যদিকে বাংলাদেশ বেতারে যে ক্যাসেটটি রয়েছে তা ১৮ মিনিটের। এতে ৮ মিনিট সময়ের বক্তব্য নিয়ে একটি সমস্যা তৈরি হয়ে আছে। সচরাচর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণের যে ক্যাসেট বিভিন্ন স্থানে বাজানো হয়ে থাকে তার সবগুলোর দৈর্ঘ্য এবং বক্তব্য অভিন্ন নয়। এগুলো যাচাই-বাছাই করে ক্যাসেট করা হয়নি। একদিকে মুদ্রিত আকারে যে ভাষণটি পাওয়া যাচ্ছে তাতে বেশ কিছু ভুল রয়েছে, অন্যদিকে ভাষণের অডিও এবং ভিডিওতেও বেশ কিছু গরমিল পরিলৰিত হচ্ছে। এমনটি হওয়ার কারণ হচ্ছে, ভাষণটি মুদ্রণের সময়ও কোন প্রামাণিকরণ কমিটি বিভিন্ন অডিও-ভিডিও ক্যাসেট যাচাই-বাছাই করে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি দেখেননি, সরকার এ পর্যনত্ম এ বিষয়ের ওপর কোন কমিটিই গঠন করেনি, একই সঙ্গে অডিও-ভিডিওর ৰেত্রেও একই সমস্যা বিরাজ করছে।
ফলে ভাষণের অডিও-ভিডিও এবং মুদ্রিত কোন রূপই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। এতে প্রমাণিত হয়, আমরা বঙ্গবন্ধুর এমন ঐতিহাসিক ভাষণকে এ পর্যনত্ম নানাভাবে অবহেলা বা উপেৰা করে এসেছি। এটিকে রাষ্ট্রের গুরম্নত্বপূর্ণ দলিলের মর্যাদা দেয়ার বিষয়টিই আমরা এখনও পর্যনত্ম উপলব্ধি করতে পারিনি। আব্রাহাম লিঙ্কনের ভাষণ, লেনিন, মাওসেতুংসহ পৃথিবীতে যেসব নেতার বক্তব্য ও লেখালেখি আমরা প্রায়ই উদ্ধৃত করি, বিভিন্ন রচনা খ-ে পড়ি এর সবই সেই সব দেশের সরকার অত্যনত্ম উঁচু মর্যাদার প্রামাণিকরণ কমিটির ছাড়পত্র নিয়েই তা প্রকাশের অনুমোদন দিয়ে থাকে। যে যার খুশিমতো ওই সব ভাষণ বা লেখালেখি কেউ ব্যবহার করতে পারেন না। ঐতিহাসিক মহামূল্যবান দলিলের মর্যাদাযোগ্য বক্তৃতা ও বিবৃতির ৰেত্রে এসব কমিটি নানাভাবে শব্দ, বাক্য তথা বক্তব্য যাচাই করে তবেই প্রকাশের অনুমোদন দিয়ে থাকেন। আমাদের এখানে সেই বোধ সরকারের মধ্যেও নেই। বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও নেই। ফলে অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে, কারও কারও পৰে বিকৃতভাবে উদ্ধৃত করাও সম্ভব হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি অবিকৃতভাবে সংকলিত করতে গেলে দেখা যায় এর অভিন্ন মুদ্রণ নেই। ৪০ বছর পরও যদি অবস্থা এমন থাকে তা হলে এর সঠিক রূপটি একদিন খুঁজে পাওয়া, একত্রিত করাও বেশ কঠিন হয়ে পড়বে_এতে কোন সন্দেহ নেই। অথচ আমরা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে মঞ্চে কত আবেগ দিয়ে বক্তৃতা করি, বক্তৃতা শুনি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি এখনও যেভাবে প্রচার হচ্ছে তা মোটেও কাম্য নয়। প্রয়োজন ইতিহাসবিদ, সেই সময়ে জীবিত ভিডিওকারী ব্যক্তি, ক্যাসেট বিশেষজ্ঞসহ কয়েকজন গুরম্নত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে দিয়ে একটি প্রামাণিকরণ কমিটি গঠন করা, যারা অবিলম্বে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটিকে অবিকৃতভাবে জাতির কাছে উপস্থাপন করবেন, এর লিখিত রূপ তুলে ধরবেন, একই সঙ্গে সম্পূর্ণ ভাষণের ভিডিও এবং ক্যাসেট সম্পন্ন করবেন যা ভবিষ্যতে বিনা দ্বিধায় সবাই ব্যবহার করতে পারবেন। আমার বিশ্বাস, কাজটি নিভর্ুলভাবে এখনও করা সম্ভব। প্রয়োজন যথার্থ উদ্যোগ নেয়া।

patwari54@yahoo.com
লেখক : অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

ভাষণটিকে রক্ষা করার এই কাজ অবিলম্বে শুরু করা উচিত, অনেক দেরি হয়ে গেছে, আবেগের বশবর্তী হয়ে আর কতদিন কাটাতে পারব? ভাষণটির যথাযথ সংরক্ষণে এখনই কাজ না হলে এখানেও আমাদের আবেগ সর্বস্বতাই শুধু অমর হবে, ভাষণটি নয়।

৮ মার্চ ২০১১

এই ভাষণটি প্রচারে একটু সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। ভাষনের লিখিত রূপটাই বেশী প্রচার করা দরকার। কিছু কিছু পাড়াতো অনুষ্ঠানে যেনতেন ভাবে বাজানো হয় ভাষণটা খুব দৃষ্টিকটু লাগে।- নীড় সন্ধানী

২৪ december ২০১১

আজ যিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, সেই আব্দুর রাজ্জাকের কঠিন দায়িত্ব ছিল ৭ই মার্চের দিন শেখ মুজিবকে বক্তৃতার জন্য রেসকোর্সে নিয়ে যাওয়া ও বক্তৃতা শেষে শেখ মুজিবকে তার বাড়ি পৌঁছে দেয়া। ২০১০ সালে বিডিনিউজ২৪কে ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে আব্দুর রাজ্জাকের স্মৃতিচারণ।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে রাজ্জাকের স্মৃতিচারণ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার নানা ষড়যন্ত্র চলছিল। শোনা যাচ্ছিল-এমনকি হতে পারে কমান্ডো হামলা। এমন পরিস্থিতিতে রেসকোর্সে ভাষণের আগে-পরে বঙ্গবন্ধুকে আনা নেওয়ার দায়িত্ব ছিল আমার উপর। আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান হিসেবে সেই দায়িত্ব ছিল আমার।

ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাসা থেকে সমাবেশস্থলে আনা নেওয়ায় বিশেষ কৌশল নিতে হয়েছিল। পূর্ব পরিকল্পিত যাত্রাপথ পাল্টে বঙ্গবন্ধুকে আনা হয় রেসকোর্সে। ভাষণের পরেও বদলাতে হয়েছিল পথ।

ধানমণ্ডি থেকে রেসকোর্স হয়ে ফের বাসায় পৌঁছে দেওয়ার পরই স্বস্তিবোধ করছিলাম।

১৯৭১ সালে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ১ মার্চেই বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত দেন ৭ মার্চে ভাষণ দেবেন তিনি। এসময় দলমত নির্বিশেষে ছাত্র-যুবা, আওয়ামী লীগসহ শীর্ষনেতারা গিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে তাদের মতামত দিতেন।

৩ মার্চ পল্টন ময়দানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত সমাবেশে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সে ভাষণ দেবেন।

ওই দিন কী ঘোষণা দেবেন বঙ্গবন্ধু? এ নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। আগেরদিন (৬ মার্চ) ইকবাল হল থেকে সব ছাত্র আমার কাছে এসে দাবি করলো, কাল (৭ মার্চ) যেনো স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু।

রাতে ৩২ নম্বরে গেলাম। বঙ্গবন্ধু বাসার উপরতলায় ছিলেন। অনেকের মাঝে স্বাধীনতার ডাক দেওয়া নিয়ে দ্বিমতও রয়েছে। তাদের মত, স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেই তো দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে না। বঙ্গবন্ধু বলেন-‘চুপ থাক’। টিপিক্যাল ওয়েতে বঙ্গবন্ধু আমাকে চোখ টিপ দিলেন।

বঙ্গবন্ধু বলেন, “যথাসময়ে সঠিক কথাটাই বলব আমি।”

এদিকে বঙ্গবন্ধুকে ৭ মার্চ রেসকোর্সে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরি করি। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান হিসেবে আমার উপর দায়িত্ব ছিল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যাওয়া ও আনার। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল, অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলোতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে থাকার।

৭ মার্চ। আমার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। ৭ মার্চের সকাল থেকেই আমি ছিলাম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সঙ্গে। ঠিক হলো তিনটি গাড়ি আমাদের সঙ্গে রেসকোর্সে যাবে। দুইটি গাড়িতে থাকবে যাদের গোঁফ আছে এবং তাদের পরণে থাকবে পাঞ্জাবি। চুল থাকবে ব্যাক ব্রাশ করা। সামনের গাড়িতে আমরা। ঠিক দুইটার সময় ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে বের হন বঙ্গবন্ধু।

আমি অত্যন্ত চিন্তিত ছিলাম। কোনো অঘটন ঘটে কিনা! তখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্র চারদিকে। বলা হয়েছিল-কমান্ডো অ্যাটাক করে হত্যা করা হবে। আকাশে হেলিকপ্টারও ঘুরছে। অ্যাটাক হলে বাঁচানো যাবে না।

৩২ নম্বর থেকে এলিফ্যান্ট রোড, তৎকালীন পিজি হাসপাতালের পাশ দিয়ে রেসকোর্সে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যাওয়ার কথা।

যাত্রার শুরুতেই তাৎক্ষণিকভাবে আগের সব পরিকল্পনা বদলে ফেলি। আমি কৌশলটা নিলাম-যেভাবে যাওয়ার কথা ওভাবে যাবো না। বঙ্গবন্ধুকে আমাদের গাড়িতে তুললাম। গাড়ির ভেতরে বঙ্গবন্ধুকে রেখে আমরা এমনভাবে দাঁড়ালাম যাতে তাকে দেখা না যায়।

এবার বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রওনা দিলাম নিউমার্কেট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে হাইকোর্টের পাশ দিয়ে রেসকোর্সের পথে। বিশাল জনতার ঢেউয়ের মধ্যে সোজা মঞ্চে উঠলেন তিনি। পিছনে দাঁড়িয়ে মহিউদ্দিন, আমি আর গাজীউল হক। সমাবেশে কোনো সভাপতি ছিল না।

গিয়েই বঙ্গবন্ধু আমাকে বলেন, “মাইকটা দে।”

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু-স্লোগান দুটি দিতে দিতেই বঙ্গবন্ধুকে মাইক দিই।

এর পরের ঘটনাতো ইতিহাস। ১৭ মিনিটে ঐতিহাসিক ভাষণটি শেষ করেন তিনি।

লাখ-লাখ মানুষ দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলেন প্রতিটি কথা। আর আমার প্রতিটি মুহুর্ত ছিল আশঙ্কার। কারণ, মাথার উপরে তখনো হেলিকপ্টার ঘুরছে।

ওই ভাষণেই সব নির্দেশনা পেয়ে গেলাম আমরা। জাতির জনক ৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, ডাক দেন স্বাধীনতা সংগ্রামের। মনে হল, আজকে থেকেই আমরা লডাই শুরু করে দিলাম। দেশ স্বাধীন হবেই। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে ২৫ মার্চ তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

ভাষণ দিয়ে নেমেই বঙ্গবন্ধু সোজা উঠেন গাড়িতে। কেউ জানে না আমরা কোন দিকে কোথায় যাচ্ছি। সেই একই কায়দায় (আগের পরিকল্পনা পাল্টে)। সমাবেশস্থল থেকে শাজাহানপুর, মতিঝিল কলোনির পাশ দিয়ে (আজকের) শেরে বাংলানগর হয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে।

স্বস্তি পেয়েছি, বঙ্গবন্ধুকে একেবারে, সঠিকভাবে বাড়িতে পৌঁছে দিতে পেরে।

আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু রাজাকারমুক্ত হয়নি। এটাই দুঃখজনক। আজ পর্যন্ত দেশের মানুষ মুক্তির স্বাদ পায়নি। অর্থনৈতিক, সুখী, সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়তে পারলেই বঙ্গবন্ধুর আত্মা শান্তি পাবে।

এখন বর্তমান প্রজন্মের কাছে আমার তিনটি চাওয়া। দেশকে রাজাকারমুক্ত করতে হবে, সুখী সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর সোনার বাংলা গড়তে হবে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হবে। এই তিনটি কাজই এগিয়ে নিয়ে যাক নতুন প্রজন্ম।

পরিচয়: ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে øাতকোত্তর ডিগ্রি নেন আব্দুর রাজ্জাক। ১৯৬৫ থেকে ৬৭ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ থেকে ৭৫ সাল পর্যন্ত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান ছিলেন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের এই সদস্য বর্তমান সংসদেও প্রতিনিধিত্ব করছিলেন, পাশাপাশি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি তিনি।

৭ মার্চ ২০১৩

সাতই মার্চের ভাষণ কেউ ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিল? ঠিক জানা নেই। আজ ডেইলি স্টারে সৈয়দ বদরুল আহসান তার এক লেখায় ভাষণের অংশবিশেষ অনুবাদের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এরকম বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, হওয়া উচিত একবারে ধরে ধরে পূর্ণাঙ্গ একটি অনুবাদ।

“My brothers, I come before you today with a heavy heart.
All of you know hard we have tried. But it is a matter of sadness that the streets of Dhaka, Chittagong, Khulna, Rangpur and Rajshahi are today being spattered with the blood of my brothers . . .
… With great sadness in my heart, I look back on the past twenty three years of our history and see nothing but a history of the shedding of the blood of the Bangalee people. Ours has been a history of continual sadness, repeated bloodshed and innocent tears.”
It was a tale of exploitation Bangabandhu related to that million-strong crowd on the day. And yet there was the conciliatory in his approach to the state of Pakistan:
“I even went to the extent of saying that we, despite our majority, would still listen to any sound ideas from the minority, even if it were a lone voice. I committed myself to supporting any measure that would lead to the restoration of a constitutional government.”
Mujib listed the meetings he had thus far had with politicians from West Pakistan and then moved to matter of the sudden postponement of the national assembly session on 1 March and Yahya Khan’s invitation to him to join a round table conference in Rawalpindi on March 10:
“Now Yahya Khan says that I had agreed to a round table conference on the 10th. I had said, ‘Mr. Yahya Khan, you are the president of this country. Come to Dhaka, come and see how our poor Bangalee people have been mown down by your bullets, how the laps of our mothers and sisters have been robbed and left empty and bereft of children, how my helpless people have been slaughtered’.
Earlier, I had told him there could be no round table conference. What round table conference? Whose round table conference? Mujibur Rahman cannot step on the blood of the martyrs and join a round table conference.”
The oratory reaches a crescendo. He tells the junta in no ambiguous terms:
“You have called the national assembly into session, but you must first agree to meet my demands. Martial law must be withdrawn; all soldiers must go back to the barracks; an inquiry into the killings must be initiated; and, power must be transferred to the elected representatives of the people.
Only then can we consider if we can or cannot join the round table conference.”
Bangabandhu then proceeded to outline a series of steps as part of his non-violent non-cooperation movement, warning the Bangalees that they needed to be on alert against the enemy:
“I call upon you to turn every home into a fortress against their onslaught. Use whatever means you have to confront the enemy . . . Even if I am not around to give you directives, I ask you to continue your movement in a ceaseless manner.”
And then came the decisive moment, the words that defined the road to the future:
“Since we have given blood, we will give more of it. Insha’Allah, we will free the people of this land.
The struggle this time is for emancipation. The struggle this time is for independence.
Joy Bangla!”

https://twitter.com/urumurum/status/316438991123648512

স্বাধীনতা ঘোষণার চিন্তা ৩ মার্চেই ওয়াশিংটনকে জানানো হয়

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পরিকল্পনা নিয়ে একটি চমকপ্রদ তথ্য উদ্ঘাটিত হলো। আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণা ২৬ নাকি ২৭ মার্চ—এ নিয়ে বিতর্ক চলছেই। এই প্রেক্ষাপটে সম্ভবত এই প্রথম কোনো মার্কিন দলিল থেকে জানা গেল, একাত্তরের ৩ মার্চেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার চিন্তা এবং ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস খোলার পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়েছিল।
মার্কিন কূটনীতিক ক্রেইগ ব্যাক্সটারের কাছে আওয়ামী লীগের পক্ষে এই তথ্য প্রকাশ করেছিলেন পাকিস্তান দূতাবাসের বাঙালি পলিটিক্যাল কাউন্সিলর এবং পরে অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া। ব্যাক্সটার পরে দক্ষিণ এশীয় বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন এবং বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে পরিচিত হন। ব্যাক্সটার একাত্তরে পররাষ্ট্র দপ্তরে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ছিলেন। ২০০৮ সালে তিনি মারা গেছেন। অধ্যাপক ব্যাক্সটার বাংলাদেশ বিষয়ে একাধিক বই লিখেছেন।
বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ ও তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন মনে করেন, ‘এই নতুন তথ্য উদ্ঘাটন একটা গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা। মার্কিন সরকারি নথি থেকেই এটা আমরা জানছি। সুতরাং এর সত্যতা নিয়ে কোনো বিতর্কের সুযোগ দেখি না।’
প্রথম আলোর কাছে এ বিষয় দলিলটির মূল নথির আলোকচিত্র রয়েছে। এতে দেখা যায়, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে ওই বার্তা পৌঁছাতে ঢাকা থেকে একজন বার্তাবাহক ওয়াশিংটনে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পরিচয় জানা যায়নি।
কামাল হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগের কে বা কাকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তা তাঁর অজানা ছিল। তিনি অবশ্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘৩ মার্চ ডাকা জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ১ মার্চে ইয়াহিয়া স্থগিত করেন। এ সময় বঙ্গবন্ধু একটি ব্রিফ তৈরি করতে নির্দেশ দেন এবং দেশের বাইরে যে যাবেন, তাঁর কাছেই তা দিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। আমি আবু সাঈদ চৌধুরী ও হোসেন আলীর কাছে এর দুটি অনুলিপি পৌঁছে দিয়েছিলাম।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণার সিদ্ধান্ত মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে জনাব কিবরিয়ার অবহিত করার বিষয়টিকে ‘সন্দেহাতীতভাবে মুজিবের জ্ঞাতসারে’ এবং মুজিবের পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন।
উল্লিখিত মার্কিন নথিটির অবিকল তরজমা নিচে তুলে ধরা হলো:
গোপনীয় তারবার্তা। প্রাপক মার্কিন দূতাবাস, ইসলামাবাদ, মার্কিন কনসাল ঢাকা। বিষয়: স্বাধীনতা বিষয়ে বাঙালি পাক কর্মকর্তা। তারবার্তা প্রস্তুতকারী ব্যাক্সটার। নং স্টেট ০৩৬২৫৫।
‘১. ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ব্যাক্সটারের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ করেন পলিটিক্যাল কাউন্সিলর কিবরিয়া। এ সময় তিনি স্পষ্ট করেন যে ডেপুটি চিফ অব মিশন করিম [এস এ করিম, বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রসচিব] এবং পাকিস্তান দূতাবাসের অন্য বাঙালি কর্মকর্তা এবং তিনি তাঁর নিজের পক্ষে “বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার” পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং বাঙালি কর্মকর্তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কী হবে, সে বিষয়ে কথা বলতে এসেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাঙালি কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই সম্মত হয়েছেন যে স্বাধীনতার ঘোষণার খবর ওয়াশিংটনে পৌঁছামাত্রই করিম ঢাকার নির্দেশনার অপেক্ষায় না থেকে [স্বাধীন বাংলাদেশ] দূতাবাস প্রধানের দায়িত্ব নেবেন। তাঁদের মূল উদ্বেগ হচ্ছে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতা দমনে যে অতিরিক্ত [সম্ভাব্য] সেনা অভিযান চালাবে, এর ফলে মাত্র কয়েক দিনের জন্য একটা ছেদ নয়, বরং তা দীর্ঘ বিলম্ব সৃষ্টি করবে। কিবরিয়া দ্রুত মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা করেন।
২. এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে কিবরিয়া পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন এবং আওয়ামী লীগের সামনে থাকা বিকল্পগুলো উল্লেখ করেন এবং বলেন, তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে (“আর পিছিয়ে না আসার পর্যায়ও অতিক্রান্ত হয়েছে”) এখন আর অন্য বিকল্প নেই। সুনির্দিষ্টভাবে কিবরিয়া আরও বলেন, এদিন সকালেই ঢাকা থেকে এক ভদ্রলোক এসেছেন। (কিবরিয়া বলেন, তিনি আওয়ামী লীগের কর্তৃপক্ষীয় বক্তব্য নিয়েই এসেছেন) তিনি এই বার্তা নিয়ে এসেছেন যে ক্রান্তিকালের জন্য প্রস্তুতি এখনই গ্রহণ করা উচিত হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির মিশ্রণ এবং [ঢাকার] এই বার্তা বিবেচনায় নিয়ে দূতাবাসের বাঙালি কর্মকর্তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের লক্ষ্যে ভিত্তি তৈরির কাজ এখনই শুরু করতে হবে।
৩. রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে ইয়াহিয়ার উদ্যোগকে কিবরিয়া যথেষ্ট বিলম্বিত বলে উল্লেখ করেন। সেই সঙ্গে তিনি যোগ করেন যে বাঙালিরা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, তারা আরও একটি সপ্তাহের অপেক্ষা বরদাশত করবে না। এমনকি শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণের আগেই এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে জনগণ সম্ভবত চাপ সৃষ্টি করবে এবং স্বাধীনতার ঘোষণা ৭ মার্চের পরে যাবে না।
কিবরিয়া আশঙ্কা করেন, মুজিব ইতস্তত করবেন এবং সে কারণে “বাম চরমপন্থীদের” কাছে তিনি তাঁর নেতৃত্ব হারাবেন। “বাম চরমপন্থীরা” জনতাকে নিজেদের উদ্দেশ্যসাধনে কাজে লাগাবে। কিবরিয়া আরও গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কথিতমতে ইতিমধ্যেই বাঙালি পুলিশকে নিরস্ত্র করেছে এবং ইতিমধ্যে কতিপয় দমনমূলক পদক্ষেপ (আজকের সংবাদপত্র দ্রষ্টব্য) নিয়েছে। তিনি অনুমান করেন, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী “আমার দেশবাসীর প্রতি কসাইগিরি” চালাতে পারবে বটে। তবে তাতে বড়জোর কার্যকর স্বাধীনতা অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে, কিন্তু তাকে স্তব্ধ করা যাবে না। বরং ‘বর্বরোচিত’ কাণ্ড ঘটালে তা বাঙালি প্রতিরোধকে আরও কঠিন করে তুলবে। তিনি পৌনঃপুনিকভাবে গুরুত্বারোপ করেন যে [স্বাধীনতা ঘোষণা থেকে] এখন আর পিছিয়ে আসা সম্ভব নয়। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অন্যরাও সহমত পোষণ করেন।
৪. কিবরিয়া জানতে চান, বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অবস্থান কী হবে? তিনি এটা বুঝতে পারছেন যে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের পরে [মার্কিন] পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকবে না। কিন্তু তাঁর উদ্বেগটা হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং [যুক্তরাষ্ট্র সরকারের] স্বীকৃতি প্রদান (ওপরে যেভাবে উল্লিখিত) বিলম্বিত হতে পারে, তার অন্তর্বর্তীকালে পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কটা কী দাঁড়াবে। ব্যাক্সটার ইঙ্গিত দেন যে আমরা স্বাভাবিকভাবেই এখানে এবং ঢাকার মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রাখব। কিন্তু এখানে কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ রক্ষা করা সমীচীন হবে না। কিবরিয়া যুক্তিটি গ্রহণ করলেন। তবে ভবিষ্যতে তাঁরা যে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ করতে পারেন, সেই সম্ভাবনা কিবরিয়া নাকচ করেননি। তিনি একই সঙ্গে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যোগাযোগের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এবং জানতে চান যে চরম প্রয়োজনে পররাষ্ট্র দপ্তরের চ্যানেল ব্যবহার করা যাবে কি না। ব্যাক্সটার সরাসরি এর উত্তর এড়িয়ে বলেছেন, এটা অনিয়মিত, তবে যখন অনুরোধ করা হবে, সেই সময় ও বিদ্যমান পরিস্থিতির আলোকে তা বিবেচনা করা হবে।
৫. কিবরিয়া কিছু প্রশাসনিক বিষয় নিয়েও কথা বলেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করলে পশ্চিম পাকিস্তান তা চ্যালেঞ্জ করবে। তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা বিশ্বাস করেন, সেই পরিস্থিতিতে [ওয়াশিংটনে নিযুক্ত পাকিস্তানের] রাষ্ট্রদূত হিলালি তখন পাকিস্তান দূতাবাস থেকে বাঙালি কূটনীতিকদের বহিষ্কারের নির্দেশনা পাবেন এবং তা অনুসরণ করবেন। তিনি তাঁদের বেতন-ভাতাও বন্ধ করে দেবেন। কিবরিয়া এ বিষয়ে কোনো সহায়তা চাননি। কিন্তু বলেছেন, দূতাবাসের মধ্যে বাঙালিরা তখন একটা “পুলিশ পরিস্থিতি” সৃষ্টি করতে পারে। ব্যাক্সটার ইঙ্গিত দেন যে সেটা হবে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক এবং তা যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে একটা জটিল অবস্থার মুখে ফেলে দেবে। কিবরিয়া এ বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন এবং বলেছেন, তিনি তাঁর সহকর্মীদের এ ধরনের পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেবেন।
৬. কিবরিয়া আলোচনার পুরো সময় একাগ্রচিত্ত ছিলেন। কিবরিয়া বলেন, তিনি ও অন্যদের পাকিস্তানি হিসেবে থাকাটাকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তাঁরা এটা দেখতে পাচ্ছেন না যে পশ্চিম পাকিস্তান গণতন্ত্রের পথে যাবে এবং সে কারণে একমাত্র বিকল্প হিসেবে এখন তাঁরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন দিচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, সবার জন্যই সাম্প্রতিক দিনগুলো কঠিন হয়ে পড়েছে এবং নিকট ভবিষ্যতে কোনো সান্ত্বনা নেই। তিনি কথার ইতি টেনে এই মন্তব্য করেন, “আমরা যদি ব্যর্থ হই, তাহলে আমরা বিশ্বের সবচেয়ে অসুখী মানুষে পরিণত হব।’” শেষ।
উল্লেখ্য, এই নথিটি অনুমোদন করেছেন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ক্রিস্টোফার ভ্যান হোলেন। তাঁর ছেলে কংগ্রেসম্যান ক্রিস ভ্যান হোলেন বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসে বাংলাদেশ ককাসের প্রভাবশালী সদস্য। তাঁর বাবা ৯০ বছর বয়সে গত ৩০ জানুয়ারি মারা যান। ৩১ জানুয়ারি ২০১৩ ওয়াশিংটন পোস্ট এক শোকগাথায় বলেছে, ‘ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলতে থাকলেও একাত্তরের বাংলাদেশ সংকট মোকাবিলা করতেই ভ্যান হোলেন তাঁর সর্বশক্তি নিঃশেষ করেছিলেন।’
জনাব কিবরিয়া ২০০৬ সালে ইউপিএল প্রকাশিত তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘মার্চ মাসের গোড়া থেকেই আমি ও আমার সহকর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীন বাংলাদেশের দূতাবাস খোলা সম্পর্কে বিভিন্ন পরিকল্পনা করেছিলাম।’

১৬ মার্চ ২০১৫

৭ মার্চের সেই ভাষণ এখনও নতুন, এখনও প্রেরণার: হাসিনা

একাত্তরে অগ্নিঝরা মার্চে যে ভাষণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক এসেছিল, স্বাধীনতার পঞ্চম দশকে এসে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন শেখ হাসিনা এখনও প্রেরণা নেন বাবার সেই ভাষণ থেকে।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জাতীয় মুক্তির ডাক দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক সেই ভাষণটি বাংলাদেশ গঠনে তরুণ প্রজন্মের কাছে এখনও দিক-নির্দেশনা হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

“আজকে ৪৪ বছর পরেও এই ভাষণটি যখন বাজানো হয়, আমরা যখন শুনি; তখন মনে হয়, যেন নতুন করে শুনছি,” রোববার এক অনুষ্ঠানে বলেন শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণটি বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রচারিত বলেও মনে করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।

“৪৪ বছর ধরে এই ভাষণটি কত কোটি কোটি বার যে বাজানো হয়েছে, কত কোটি কোটি বার যে মানুষ শুনেছে, বোধ হয় এর কোনও হিসাব কেউ কখনও দিতে পারবে না। কত ঘণ্টা, কত দিন, কত মাস, কত বছর, কেউ বলতে পারবে না।”

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে আসা শেখ হাসিনা বলেন, “সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের প্রেরণা এখনও শেষ হয়নি। আগামী দিনের নেতৃত্বে যারা আসবে, এই ভাষণ তাদের দিক-নির্দেশনা দেবে।”

“বাঙালি জাতির জন্য এই ভাষণ নতুনভাবে বেঁচে থাকার প্রেরণা দেবে, সাহস দেবে, যে কোনো ধরনের বাধা আসুক না কেন- তা অতিক্রম করে বিশ্ব দরবারে বাঙালি জাতিকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করবার শক্তি ও সাহস জোগাবে।”

স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকারে রয়েছেন।

“আমাদের সংগ্রাম এখনও তো শেষ হয়নি। এখনও সেই জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড, মানুষ পুড়িয়ে মারা, মানুষকে হত্যা করা, মানুষের ওপর এখনও নানাভাবে জুলুম চলছে।”

“আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদেরকে প্রেরণা দেবেন জাতির পিতা,” বলেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, “যে কোনো শক্তি, যারা আমাদের দেশের মানুষের অধিকার কেড়ে নিতে চায় যে কোনো শক্তি, যারা আমাদের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে চায়। যারা এদেশের মানুষের সব অধিকার পদদলিত করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার এটাই সময়। আর সাতই মার্চের ভাষণই দেবে সেই প্রেরণা।

“এই ভাষণের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য মনে হয় নতুনভাবে প্রেরণা দেয়, নতুনভাবে মানুষকে উজ্জীবিত করে।”

বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণ নিয়ে ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’ আয়োজিত আলোচনা সভায় একাত্তরের ৭ মার্চের দিনটিও স্মরণে আনেন শেখ হাসিনা।

“এই ভাষণটি যখন বঙ্গবন্ধু দিতে যাবেন, তখন অনেকে অনেক কথা বলেছেন, অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। আমার মায়ের কথা খুব মনে পড়ে। তিনি পর্দার আড়ালেই ছিলেন। তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক চিন্তা চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

বাঙালির ইতিহাসের বাঁক বদলের সেই ভাষণের নেপথ্যে নিজের মায়ের যে ভূমিকা ছিল, তাও উঠে আসে শেখ হাসিনার কথায়।

“এই ভাষণটি যখন আমার বাবা দিতে যাবেন, তখন অনেক লেখা, অনেক পরামর্শ নিয়ে সবাই হাজির। যখনই বঙ্গবন্ধু কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিতে যেতেন, তখন তিনি (বেগম মুজিব) একটা কাজ করতেন- সকলের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুকে কিছুক্ষণের জন্য আড়াল করে দিতেন।”

“মা আব্বাকে শোবার ঘরে নিয়ে গেলেন, আমিও সেখানে। বললেন, ‘তুমি এখানে অন্তত ১৫টা মিনিট চুপ করে শুয়ে থাক’। আমি আব্বার মাথার কাছে বসে আস্তে আস্তে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। মা পাশে মোড়াটা টেনে নিয়ে বসলেন।”

“বললেন, ‘আমি একটা কথা বলতে চাই। আজকে, তোমার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন। লাখো মানুষ তোমার সামনে। এই মানুষের ভাগ্য তোমার হাতে। অনেকে অনেক পরামর্শ দেবে, অনেকে অনেক কথা বলবে। কিন্তু, তোমার মন যে কথা বলবে, তুমি ঠিক সেই কথাটাই তোমার ভাষণে বলবে। অন্য কোনো কথা বলবে না। আর, তুমি যা বলবে- বাঙালীর জন্য সেটাই সঠিক হবে’।সেটাই হয়েছিল।”

১৯৭৫ সালে ১৫ অগাস্টের পর সামরিক সরকার আমলে এই ভাষণের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকার কথাও বলেন শেখ হাসিনা।

“পঁচাত্তরের পর এই ভাষণটা নিষিদ্ধ ছিল বাংলাদেশে, কী দুর্ভাগ্য আমাদের! এই ভাষণ বাজানো যেত না।”

১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ২১ বছর এই ভাষণটি বাজাতে গিয়ে বার বার বাধা পাওয়ার কথাও বলেন তিনি।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ- বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ’ এবং গোলাম মাওলা প্রকাশিত ‘পোয়েট অফ পলিটিক্স’ গ্রন্থ দুটির মোড়ক উন্মোচন করেন।

৭ মার্চের ভাষণের ওপর ২০০৪ সাল থেকে বিভিন্ন সেমিনারে পাঠ করা মূল প্রবন্ধ গ্রন্থিত হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ-বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ’ এ।

পোয়েট অফ পলিটিক্স গ্রন্থে ১২টি ভাষায় প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি সঙ্কলিত হচ্ছে। দ্বিতীয় সংস্করণে আরও ১৮টি ভাষায় প্রকাশিত এই ভাষণটি সঙ্কলন হবে বলে জানানো হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত অধ্যাপক সালাহউদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক শামসুল হুদা হারুন ও সাংবাদিক বেবী মওদুদকে স্মরণ করে বলেন, “আমরা ২০০৪ সাল থেকে এই অনুষ্ঠানগুলো করে যাচ্ছি। ২০০৪ সাল থেকে আমরা ভাষণগুলো সংরক্ষণ করে যাচ্ছি। ভাষণগুলো প্রকাশ করা হবে। আজকে সেই দিনটি আমাদের এল। কিন্তু, আজ আর তারা আমাদের মাঝে নেই।

“আমরা একসঙ্গে কাজ করতাম বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী নিয়ে। যেখানে প্রফেসর সালাহউদ্দীন সাহেব আমাদের সব সময় পরামর্শ দিতেন। একে একে সবাই চলে গেছে।”

অনুষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হারুন অর রশীদ ‘বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ভাষণ- কেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণের একটি’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

শুরুতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাত মার্চের পুরো ভাষণের ভিডিও প্রদর্শন করা হয়।

অনুষ্ঠানে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শাহিনুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, ‘পোয়েট অফ পলিটিকস’ গ্রন্থের প্রধান পৃষ্ঠপোষক সংসদ সদস্য নাজমুল আহসান, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সদস্য সচিব শেখ হাফিজুর রহমান বক্তব্য রাখেন।

৩ এপ্রিল ২০১৫

৭ মার্চের বঙ্গবন্ধু স্মারক মুদ্রায়

একাত্তরের ৭ই মার্চের ভাষণের ঐতিহাসিক মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি সম্বলিত বিশেষ স্মারক মুদ্রা অবমুক্ত করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ইতোমধ্যে এই মুদ্রার প্রাথমিক নকশা করা হয়েছে বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রা ব্যবস্থাপনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক শুভংকর সাহা।

তিনি বলেন, “ডিজাইনটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নোট ডিজাইন অ্যাডভাইজরি কমিটির অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।”

অ্যাডভাইজরি কমিটির অনুমোদনের পর নকশাটি প্রধানমন্ত্রীকেও দেখানো হবে। প্রধানমন্ত্রী সম্মতি দিলে তৈরি হবে মুদ্রা তৈরির কাজ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, রুপা ও সোনার প্রলেপ দিয়ে তৈরি হবে এই স্মারক মুদ্রা। প্রধানমন্ত্রী বিদেশি অতিথিদের এ মুদ্রা উপহার দিতে চান।

পৌনে দুই ইঞ্চি ব্যাসের এই মুদ্রার এক পাশে থাকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের প্রতিকৃতি। অন্যপাশে থাকবে ভাষণের মূল বক্তব্য- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।

মুদ্রাটি আগামী বিজয় দিবসের আগে অবমুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। প্রাথমিকভাবে ঠিক হয়েছে, রুপার মুদ্রা বিক্রি হবে তিন হাজার টাকায়। আর ‘গোল্ড কোটেড’ মুদ্রার দাম হবে চার হাজার টাকা। তবে মুদ্রার অভিহিত মূল্য কতো হবে তা এখনও ঠিক হয়নি।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতপ্রাপ্ত বিশেষ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, স্থান ও ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রা ব্যবস্থাপনা বিভাগ এ পর্যন্ত ১৭টি স্মারক মুদ্রা, নোট ও ফোল্ডার তৈরি করেছে।

এর আগে বাংলাদেশের বিংশতম বিজয় দিবস উপলক্ষে ১৯৯১ সালে রুপার স্মারক মুদ্রা বের করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

২৫তম অলিম্পিক গেমস, বাংলাদেশ ব্যাংকের রজতজয়ন্তী, স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী, বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমুখী সেতুর জন্য দুটি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ-২০১১, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী, মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ের ৪০ বছর পূর্তি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার ৯০ বছর পূর্তি উপলক্ষে স্মারক মুদ্রা অবমুক্ত করা হয়।

এছাড়া বাংলাদেশের বিজয় দিবসের ৪০ বছর পূর্তিতে স্মারক নোট ও ফোল্ডার, ভাষা আন্দোলনের ৬০ বছর পূর্তিতে ফোল্ডার, সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেডের ২৫ বছর পূর্তিতে ফোল্ডার করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এসব স্মারক মুদ্রা ও নোট বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে সর্বসাধারণের কাছে বিক্রি করা হয়। স্মারক মুদ্রা ও নোট শুধু সংরক্ষণের জন্য; বিনিময়ের কাজে ব্যবহারযোগ্য নয়।

২৬ আগস্ট ২০১৫

৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ একটি অনুপুঙ্খ পাঠ

শামসুজ্জামান খানঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চ ১৯৭১-এর ইতিহাসে অনন্য ভাষণটি অধিকারবঞ্চিত বাঙালির শত সহ¯্র বছরের সংগুপ্ত আশা-আকাক্সক্ষা ও স্বপ্নের উচ্চারণে সমৃদ্ধ। মাত্র ১৯ মিনিটের ওই ভাষণে তিনি এত কথা অমন অমোঘ তীক্ষèতা, সাবলীল ভঙ্গি, বাহুল্যবর্জিত কিন্তু গভীরভাবে অন্তর ছুঁয়ে যাওয়া ভাষায় কেমন করে বলতে পারলেন সে এক বিস্ময় বটে! ভাষণের মূল কথা যদি খুঁজি তা হলে দেখা যায়, পূর্ব বাংলার মানুষের বঞ্চনার ইতিহাস ও অধিকারহীনতার বিষয় এতে দীপ্র হয়ে উঠেছে; এবং পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের মাধ্যমেই এ অবস্থা থেকে বাঙালির সার্বিক মুক্তি সম্ভবÑ এই বক্তব্যই বঙ্গবন্ধু তার বক্তৃতা-শৈলীর অতুলনীয় ভঙ্গিতে কখনো আবেগ, কখনো যুক্তি, কখনো প্রশ্ন বা ইচ্ছাকৃত জোরাল পুনরুক্তির মাধ্যমে সোচ্চার করে তুলেছেন; কিংবা বিশেষ স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে সংগত কারণেই কৌশলময় ভাষা বা ইঙ্গিতে শ্রোতাদের মনে গেঁথে দিয়েছেন।
কোনো দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিবর্তন-প্রক্রিয়ার বিপুল মানুষের বাস্তব জীবনযাত্রার চাপ ও বিদ্যমান ঘটনা প্রবাহের মিথষ্ক্রিয়া কোনো দূরদর্শী ও গণভিত্তিসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতাকে মূলধারার মুখপাত্র বা মুখ্য চরিত্র করে তোলে; অথবা কোনো দমিত, দলিত, নিগৃহীত জাতির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ক্যারিশম্যাটিক মূল নেতাই জনগণের মানস-চেতনার স্তর ও বাস্তবিক ভেতর তাগিদের সাথে নিজস্ব বোধ-বিশ্বাস-ধারণা-বিবেচনা ও সময়জ্ঞানকে অন্বিত করে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বা স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়কে পরিণত হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রে তেমনটিই ঘটেছিল।

দুই
দুঃখ-দারিদ্র্যপীড়িত, চিন্তাচেতনায় পশ্চাৎপদ, এককালের ব্রিটিশ-ভারতের হিন্টারল্যান্ড এবং পরে ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পাকিস্তানের কলোনিপ্রতিম পূর্ব বাংলার মানুষের মনে বাঙালির অসংখ্য কৃষক বিদ্রোহ, মাতৃভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করার আন্দোলন ও নানা গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জাগৃতি এবং জাতীয় ঐক্যের বীজমন্ত্র রোপিত হচ্ছিল।
জাতীয়তাবাদী আন্দোলন মূলত কৃষকেরই আন্দোলন। আর তাতে কৃষকের সমস্যা আর তার ভাষার অধিকার প্রাধান্য পায়। কৃষিভিত্তিক পূর্ব বাংলায়ও তাই নবজাগৃতির বাহন হয়েছিল বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, তীব্র অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তির চেতনা এবং এক নতুন ও শক্তিশালী বাঙালি জাতীয়তাবাদ। এই ইতিহাস, ঐতিহ্য ও তার বিশিষ্ট রূপ, এমনকি ভবিষ্যৎ পথরেখা সম্পর্কে বিগত শতকের পঞ্চাশের দশকের জনপ্রিয় বাঙালি নেতা শেখ মুজিবুর রহমান যে বিশেষভাবে সচেতন ছিলেন তার প্রমাণ আছে ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট পাকিস্তান গণপরিষদে দেওয়া তার ভাষণে। তাতে তিনি বলেন,Sir, you will see that they want to place the word ‘East Pakistan’ instead of ‘East Bengal’. We have demanded so many times that you should use Bengal instead of Pakistan. The word ÔBengalÕ has a history, has a tradition of its own. তবে তিনি শুধু ঐতিহ্য-গর্বের প্রকাশ ঘটাননি, তার মধ্যে এনেছেন যুক্তি ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতির কথা। তাই পরের লাইনেই বলেছেন you can change only after the people have been consulted. If you want to change it then we have to go back in Bengal and ask them whether they accept it..

তিন
বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিকাশধারার সাথে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকদের পূর্ব পাকিস্তানের জন্য প্রণীত আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক নীতির দ্বন্দ্ব-সংঘাত-অভিঘাতের প্রতিক্রিয়ায় বাঙালিদের মনে যে নতুন জাতীয় চেতনার সৃষ্টি হয়, তারই ফলে গড়ে ওঠে বাঙালি জাতীয়তাবাদভিত্তিক স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন। এই আন্দোলনের কর্মী-সংগঠক, সমর্থক, বিশেষ করে এর নেতৃপুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় জনসমর্থন ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে পাকিস্তানের ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে পূর্ব বাংলার সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসন অর্থাৎ স্বশাসনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী সামন্ততান্ত্রিক-মৌলবাদীচক্র এবং তাদের সহযোগী সামরিক ও ছদ্ম-সামরিক স্বৈরশাসকরা গণতন্ত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থাকে বানচাল করার লক্ষ্যে বারবার সামরিক শাসন জারি করে পূর্ব বাংলায় বাঙালির স্বতন্ত্র জাতিসত্তা ও তাদের স্বকীয় সংস্কৃতির বিকাশকে ধ্বংস করার প্রয়াস পায়। এ লক্ষ্যে তারা ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে পূর্ব বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ কায়েম করে। পাকিস্তানি শাসকদের এই হীনকৌশল উপলব্ধি করেই ১৯৫৮ থেকে ১৯৭০Ñ এই এক যুগ ধরে বাঙালি জাতির আপসহীন নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৬০-৬১ সাল থেকেই প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য যেসব পদ্ধতি-পন্থা অবলম্বন করে জাতীয় স্বাধীনতার আন্দোলনকে তুঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন, তার সফল পরিসমাপ্তির রাজনৈতিক ও মুক্তিযুদ্ধের রণকৌশলের এক চমৎকার রূপরেখা তার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। এই ভাষণে স্বাধীনতাসংগ্রামকে মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত করার কৌশল এবং তাতে সাফল্য লাভের দিক-নির্দেশনা দেওয়া আছে।
১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে বিপুল বিজয় অর্জন করার পর পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও পশ্চিম পাকিস্তানি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো নানা কূটকৌশল, শঠতা ও স্বৈরাচারী পন্থায় সংখ্যাগুরু বাঙালির এই নির্বাচনী বিজয়ের মাধ্যমে অর্জিত রাজনৈতিক ক্ষমতালাভের অধিকারকে বানচাল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়; এবং এই অগণতান্ত্রিক ও ঘৃণ্য কাজের জন্য তারা সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বাঙালিকে চিরতরে দাবিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা শুরু করে। এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। এই অসহযোগ আন্দোলনের পরিকল্পনা, এর আদেশ-নির্দেশের পরিপূর্ণতা, এর বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং এর পেছনে বাংলার সকল মানুষের সমর্থন একে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে সরকার ও দেশ পরিচালনার এক জনপ্রিয় সনদে পরিণত করে। ফলে গোটা পূর্ব বাংলার পাকিস্তানি স্বৈরাচারী ও অগণতান্ত্রিক সরকার-কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ ও নেতৃত্বে কার্যত (De-facto) একটি বিকল্প নির্বাচিত সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এর মধ্য দিয়ে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্বাংশের অবসান ঘটিয়ে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র গণপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তিও প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এই নতুন রাষ্ট্রের নৈতিক, আদর্শিক এবং গণতান্ত্রিক শাসন পরিচালনার জন্য বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তাজউদ্দিন আহমদ ও অন্যরা ৩৫টি নির্দেশমালা জারি করেন।
বঙ্গবন্ধুর এই অসহযোগ আন্দোলন এবং রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার নির্দেশমালার গুরুত্ব এখানে যে গোটা বাংলাদেশের মানুষ বিপুলভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছিল, এর মাধ্যমে সরকারি প্রশাসন চলছিল এবং বাংলার জনগণ অঙ্গীকারদীপ্ত প্রত্যয়ে এর জন্য জানবাজি রেখেছিল। উল্লেখ্য, এর আগে ইংরেজ আমলে মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন করেছিলেন। সে আন্দোলন জনসমর্থন পেলেও প্রকৃতিতে ছিল নিষ্ক্রিয় এবং তার সাফল্য ছিল পরোক্ষ ও আংশিক। কারণ তিনি সরকার পরিচালনা করতে পারেননি। এমনকি দেশীয় আমলাদেরও ইংরেজদের আনুগত্য ত্যাগ করে তার আনুগত্যে আনতে পারেননি। এর সাথে তুলনায় বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ পাকিস্তানি শাসকচক্রের দীর্ঘ ধারাবাহিকতার শোষণ-বঞ্চনার অবসানের লক্ষ্যে ছিল এক চূড়ান্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ। বঙ্গবন্ধুর অসহযোগের পেছনে জনগণের নির্বাচনী ম্যান্ডেট ছিল, মহাত্মা গান্ধীর তা ছিল না। তাই তার অসহযোগ আন্দোলনের ভিত্তি ছিল দুর্বল; এবং তাই তা স্বশাসনের পর্যায়ে উন্নীত হয়নি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ স্বশাসনের স্তরে পৌঁছেছিল।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশের তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে বিচার করলে একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই এই ঘোষণা দেওয়ার বৈধ অধিকারী ছিলেন। কারণ ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে তার নির্বাচনী বৈধতা ও জনগণের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ম্যান্ডেট ছিল। দ্বিতীয়ত, ৩ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে বাংলাদেশের বেসামরিক প্রশাসনের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বঙ্গবন্ধু যে কর্তৃত্বভার গ্রহণ করেছিলেন তার কাছে হস্তান্তরিত হয়েছিল। পূর্ব বাংলায় শুধু ক্যান্টনমেন্টসমূহেই পাকিস্তানের কিছুটা কর্তৃত্ব টিকে ছিল। গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র বঙ্গবন্ধুর কর্তৃত্বের কাছে আনুগত্য প্রকাশ করেছিল। পূর্ব বাংলার সরকারি প্রশাসন, উচ্চ আদালত, ব্যাংক ও অর্থনৈতিক সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ, সেবা খাত, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, এমনকি ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আদেশ-নির্দেশ নিয়ে তাদের দৈনন্দিন কর্মকা- চালিয়েছেন। অন্য কারও এই আইনগত ভিত্তি (জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত বিজয়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলনেতা) ও জনগণের দেওয়া নির্বাচনী বৈধতা ছিল না। তাই অন্যদের ঘোষণার কোনো আইনগত বা রাষ্ট্রগঠনগত তাৎপর্য নেই।
বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন : ‘আর এই ৭ দিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছেন প্রত্যেকটা শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছিয়ে দেবেন। সরকারি কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি, তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে খাজনা, ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো।’ এসব নির্দেশমূলক কথা বলার নৈতিক শক্তি, আইনগত ভিত্তি কোনো ঘোষকের ছিল না। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘দুঘণ্টা ব্যাংক খোলা থাকবে, যাতে মানুষ মাইনাপত্র নেবার পারে। পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না।’

চার
বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বাঙালি শত শত বছর ধরে যে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছে, সংগ্রাম করেছে, রক্ত দিয়েছে, অসংখ্য কৃষকবিদ্রোহে অংশ নিয়েছে এবং তার ফলে স্বাধীনতার যে প্রত্যাশাটি উন্মুখ হয়ে উঠেছে তাকে ভাষা দিয়েছেন এবং এই স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে প্রস্তুত একটি ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতি সৃষ্টি করেছিলেন। তাই তিনি বাঙালি জাতির ¯্রষ্টা এবং এই সংগ্রামের ফলে সৃষ্ট বাংলাদেশের রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও অসাধারণত্ব বহুমাত্রিক। বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বিচার করলেও এই ভাষণ অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ। কেউ কেউ এ ভাষণকে আব্রাহাম লিংকনের ‘গেটিসবার্গ এ্যাড্রেস’ (১৮৬৩) বা মার্টিন লুথার কিং (জুনিয়র)-এর ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ (১৯৬৩) ভাষণের সাথে তুলনা করেন। এই তুলনাকে যথাযথ মনে হয় না। ওই দুটি ভাষণের প্রেক্ষাপট আলাদা; বঙ্গবন্ধুর মতো বিপুল মানুষের আকাশ ছোঁয়া প্রত্যাশার চাপ এবং প্রবল শত্রুপক্ষের মারণাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার সম্ভাবনার মধ্যে তাদের ওই ভাষণ দিতে হয়নি। তবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে উইনস্টন চার্চিলের একটি ভাষণের সাথেই শুধু বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কিছুটা তুলনা চলতে পারে। তবে সেখানেও চার্চিল শত্রুপক্ষকে আকাশে, মাটিতে এবং জলরাশিতে আক্রমণ করতে চেয়েছিলেন মিত্রশক্তির প্রবল শক্তিশালী অবস্থান থেকে; কিন্তু বঙ্গবন্ধু, ‘আমরা ভাতে মারব, পানিতে মারব’ কথাগুলো উচ্চারণ করেছিলেন তার জনসভাকে চারদিক থেকে ঘিরে রাখা পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর সর্বাধুনিক অস্ত্র, যুদ্ধ-প্রযুক্তি ও উন্নত কৌশলসমৃদ্ধ পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর উদ্দেশে। তার অবস্থা ছিল নিরস্ত্র, কিন্তু বিপুল জনসমর্থনধন্য জননেতার অসম-অবস্থান। তবে জনশক্তি যেহেতু যে কোনো মারণাস্ত্রের চেয়ে শক্তিশালীÑ বঙ্গবন্ধু সেই শক্তির অবস্থান থেকেই কথাগুলো উচ্চারণ করেছিলেন। স্পষ্টতই, বঙ্গবন্ধু শত্রুর মোকাবিলা করতে বলেছিলেন। তাই চার্চিলের এবং বঙ্গবন্ধুর শত্রুর মোকাবিলার উদ্দেশ্য এক হলেও পথ ছিল ভিন্ন। আমাদের বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ওই সব ভাষণের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর সাথে একটা জাতি-গঠন প্রক্রিয়ার পূর্ণতা এবং জনগোষ্ঠীর শত শত বছরের রাষ্ট্র্র প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা-স্বপ্ন ও বিপুল আত্মত্যাগের ইতিহাস যুক্ত রয়েছে। দার্শনিক হেগেল রাষ্ট্রগঠনকেই সর্বশ্রেষ্ঠ মানবিক কর্ম বলে আখ্যায়িত করেছেন। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রগঠনের এই মহৎ কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন বলেই তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ও বাঙালি জাতির পিতা এবং পরিবেশ-পরিস্থিতি বিচারে এই ভাষণ গোটা বিশ্বেই তুলনারহিত।

পাঁচ
এক কঠিন সংকট মুহূর্তে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-ভয়-ত্রাস এবং আশা ও সম্ভাবনায় উদ্বেল সাড়ে ৭ কোটি মানুষকে মাত্র ১৯ মিনিটের এক জাদুকরি ভাষণে রাজনৈতিক চেতনার একই উত্তুঙ্গ স্তরে এনে স্বাধীনতার জন্য মরণপণ অঙ্গীকারদীপ্ত মুক্তিসেনানীতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির মেলা ভার। ভারতবর্ষের স্বাধীনতাসংগ্রামে আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ভারতবাসীর উদ্দেশে বলেছিলেন : ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।’ নেতাজি সফল হননি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তার ৭ মার্চের ভাষণে ‘মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ’Ñ উক্তিকে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, কিশোর বয়সে তিনি সুভাষ বসুর বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মকা-ে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের কালে সুভাষ বসুর চিন্তা ও কর্মপদ্ধতির কথা তার অবশ্যই মনে পড়ে থাকবে। শুধু মনে পড়া নয়, কিশোর বয়সে মেন্টর (Mentor)-কে ছাড়িয়ে যাওয়ার বাসনাও তার মনে ছিল নিশ্চয়ই। বঙ্গবন্ধু বিপুল পাঠে অভ্যস্ত ছিলেন। বহু রাজনৈতিক মনীষীর জীবন ও কর্মের তিনি ছিলেন অনুরাগী পাঠক। তাই তার চার্চিল-চর্চাও স্বাভাবিক ঘটনা। ফলে ৭ মার্চের ভাষণ তিনি মনে মনে তৈরি করেন, তখন লিংকন, চার্চিল ও নেতাজির প্রাসঙ্গিক ভাষণকে অবশ্যই স্মরণ করে থাকতে পারেন। তবে ৭ মার্চের অনন্যসাধারণ ভাষণ, তার এবং শুধু তারই এক চিরকালীন মাস্টারপিস। তার একান্ত বিশ্বস্ত বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ একান্ত সাক্ষাৎকারে আমাকে বলেন : ‘আগের দিন রাত ৪টা পর্যন্ত জেগে আমরা তার জন্য ৭ মার্চের ভাষণ ও তার ইংরেজি তরজমা করলাম। কিন্তু ভাষণ দেওয়ার সময় দেখা গেল আমাদের প্রস্তুত করা খসড়া তার সামনে নেই। এবং যে ভাষণ দিলেন তার সাথে আমাদের খসড়ার কোনো কোনো পয়েন্ট ছাড়া আর কোনো মিলই নেই।’

ছয়
ইতোপূর্বে আমরা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটি থেকে দু-একটি অংশ প্রাসঙ্গিকতার কারণে উল্লেখ করেছি। এবার আমরা মূল ভাষণে প্রবেশ করব। কী নেই সেই সংক্ষিপ্ত ভাষণে? বাঙালি জনগোষ্ঠীর বঞ্চনার ধারাবাহিক করুণ ইতিহাস আছে, তা বর্ণনা করার সাথে যুক্ত করে দেওয়া আছে আবেগ, মুক্তিপাগল বাঙালির রক্ত ঝরানোর নির্মম স্মৃতি এবং তাদের গণতান্ত্রিক আশা-প্রত্যাশার ন্যায্যতা; আছে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকল মানুষের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধার প্রকাশ এবং যুক্তির জোরাল উপস্থিতি। এসব মিলে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি মানবিক বোধের শ্রেষ্ঠত্ব, গণতান্ত্রিক চেতনার উজ্জ্বলতা এবং নিপীড়িত মানুষের স্বাধিকার অর্জন ও আর্থ-সামাজিক মুক্তির এক অনন্য দলিল হয়ে উঠেছে। এসব গুণের জন্য এই ভাষণ শুধু বাঙালি নয়, গোটা বিশ্ববাসীকে ‘বাংলাদেশ পরিস্থিতি’র প্রকৃত সত্য অনুধাবনে সহানুভূতিশীল করেছে।
ভাষণটি গঠনে কৌশল, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা, ইতিহাস থেকে নেওয়া শিক্ষা, সময়জ্ঞান ও শব্দচয়নের মুন্সিয়ানা আছে। বাঙালিকে ‘আমার দেশের গরিব-দুঃখী-নিরস্ত্র মানুষ’, ‘আমার মানুষ’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। পূর্ব বাংলার অধিকারবঞ্চিত মানুষের জন্য আজীবন আপসহীন সংগ্রাম, জেল-জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে জনগণের একেবারে হৃদয়ের ভেতরে ঢুকে যাওয়া তার মতো নেতার পক্ষেই এই ভাষায় শ্রোতাদের সংবোধন করা সম্ভব।
মানুষকে জাগ্রত, উদ্দীপ্ত এবং তীব্র অধিকারসচেতন ও লড়াকু মানসিকতাসম্পন্ন করার জন্য সুদক্ষ বাগ্মীরা কতগুলো কৌশল অবলম্বন করে থাকেন। বঙ্গবন্ধুও তার জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে তা করেছেন পরিচ্ছন্ন দক্ষতা ও সুগভীর আন্তরিকতায়। মার্কিন সাময়িকী নিউজ উইকের ভাষায় ‘রাজনীতির’ এই ‘কবি’ ও ‘প্রকৌশলী’ আন্তরিক আবেগ, প্রয়োজনীয় তথ্য এবং বাংলার মানুষের ওপর নানা অত্যাচার-নির্যাতন-শোষণের নির্মমতা এবং তা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য হাতিয়ারপ্রতিম, ‘কী ওয়ার্ড’গুলো বারবার ব্যবহার করে নতুন ব্যঞ্জনা এবং মানুষের রক্তে বিদ্রোহের গতিবেগ সৃষ্টি করেছেন। এসব মূল কথাগুলোকে বারংবার সামনে আনায় শ্রোতাদের মনে তা স্থায়ীভাবে গেঁথে গেছে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে ‘মুক্তি’ ও ‘মুক্ত’ শব্দ দুটি বেশি গুরুত্বে বারবার ব্যবহৃত হয়েছে। সাধারণ মানুষ দুস্থ ও দুঃসহ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চায়। তাই তিনি তার ভাষণের চতুর্থ লাইনেই বলেছেনÑ ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়’; এবং অষ্টম লাইনেই আবার ‘মুক্তি’ শব্দটি এসেছে এভাবেÑ ‘এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ও সাং¯ৃ‹তিক মুক্তি পাবে।’ আবার বলেছেনÑ ‘যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হচ্ছে’, এবং ‘এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ’। তবে এই ঐতিহাসিক ভাষণের সারকথা যে বাক্যটিতে উচ্চারিত হয়েছে ‘মুক্তির’ কথা তাতে সর্বাধিক গুরুত্ব লাভ করেছে। যেমন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলার স্বাধীনতা চাননি, বাঙালির মুক্তিও চেয়েছেন। ফলে এই ভাষণ একই সাথে হয়েছে কালজ ও কালোত্তর।
বাংলার মানুষকে একাত্ম করার জন্য এবং নিজ ক্যারিশমানুযায়ী তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব অভিভাবক হিসেবে নিজ কাঁধে নেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু ‘আমার’ শব্দটিকে বারংবার ব্যবহার করেছেন। উদাহরণ : ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে’, ‘আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে’, ‘ভাইয়েরা আমার’, ‘আমার পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছে, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে আমার দেশের গরিব, দুঃখী, নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে’,Ñ ‘তাঁর বুকের ওপর হচ্ছে গুলি’, ‘আমার গরিবের উপর’, ‘আমার বাংলার মানুষের’, ‘আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে’, ‘আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে’, ‘আমার মানুষ কষ্ট না করে’, ‘আমার লোককে হত্যা করা হয়’ ইত্যাদি।
বঙ্গবন্ধু ভাষণ শুরু করেছিলেন, ‘ভাইয়েরা আমার’ বলে এবং শুরুতে বলেছিলেন ‘আপনারা সবাই জানেন এবং বোঝেন’। এবং ভাষণের শেষাংশে আসতে আসতে তার কম্যুনিকেট করার আত্মীয়সুলভ ভঙ্গিতে তিনি এমন স্তরে পৌঁছে গেছেন যে তাদের সহজেই ‘তুমি’ সংবোধন করতে পারছেন। এতে শ্রোতার সাথে তার আত্মিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়েছে এবং তার বক্তব্যের আবেদন বেড়েছে। এতে বক্তা এবং শ্রোতা একাত্ম হয়েছেন। ভাষণের কেন্দ্রবিন্দুটি ঠিক রেখে তিনি নানা অপরিহার্য উপাদানকে গ্রথিত করেছেন। তবে ভাষণের ধারাবাহিকতাকে কখনো ক্ষুণœ হতে দেননি। এবং কোনো পয়েন্টই মূল বক্তব্যকে শিথিল করেনি। বরং ওই সব আনুষঙ্গিক উপাদান মূল বক্তব্যকে সংহত ও জোরাল করেছে।
বাংলাদেশের মানুষের একটা স্বকীয় সত্তা ও নিজস্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আছে। লৌকিক ভাষা-ভঙ্গি ও বাকপ্রতিমায় তার চমৎকার ও লাগসই প্রকাশ ঘটে। এই বিশিষ্ট সত্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য চারিত্রিক দার্ঢ্য, বিদ্রোহের মানসিকতা এবং কোনো অবস্থাতেই মাথা নত না করা। বাংলার পৌরাণিক চরিত্র চাঁদ সওদাগর, সাহিত্যের চরিত্র হানিফ গাজী ও তোরাপ, কাব্য¯্রষ্টা কবি নজরুল এবং মানবিক ও রাজনৈতিক চরিত্র শেখ মুজিবে আমরা এই বিদ্রোহী সত্তার পরিচয় পাই। বাঙালি চরিত্রের এই বিশিষ্ট রূপের স্পর্শ পেয়ে ৭ মার্চের ভাষণে যুক্ত হয়েছে অনন্য বৈভব। বঙ্গবন্ধু তার আপসহীনতা ও চারিত্রিক দার্ঢ্যরে পরিচয় মুদ্রিত করেছেন লৌকিক ভাবভঙ্গির বিশিষ্ট বুলির সংযোজনে। প্রাকৃতজনের ব্যবহৃত এসব মণিমুক্তাসদৃশ কিছু শব্দ বাঙালির ব্যবহারিক জীবন থেকে নেওয়া। ওই ভাষণে বঙ্গবন্ধুর শিকড়সম্পৃক্ত বুলিসমৃদ্ধ এ রকম একটি লাইন লেখা হলোÑ ‘সাড়ে ৭ কোটি মানুষেরে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না।’
বঙ্গবন্ধু এই ভাষণকে কখনো কখনো শ্রোতাদের সাথে প্রশ্ন করে করে সত্য যাচাইয়ের ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। যেমনÑ ‘কী অন্যায় করেছিলাম? কী পেলাম আমরা?’ এসব প্রশ্ন যেন বঞ্চনার অমোঘ উদাহরণকে তুলে ধরেছে। এই ভাষণে যুক্তি ও মানবিক আবেগের নিপুণ সমন্বয় আছে। তেমনি ভাষণটিতে রাজনীতির কবির ওজঃগুণসম্পন্ন, স্পন্দনযুক্ত চমৎকার রেটরিকস (Rhetorics) আছে। যুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া একটি বাক্যÑ ‘যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজনও যদি সে হয় তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।’ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূলনীতির অন্তঃসার ব্যক্ত হয়েছে এই ভাষায়Ñ ‘এই বাংলার হিন্দু-মুসলমান বাঙালি ননবেঙ্গলি যারা আছেন তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের উপরে, আমাদের যেন বদনাম না হয়।’ ইতিহাস, আবেগ ও রেটরিক্যাল ভঙ্গির আর একটি উদাহরণ : ‘আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় ২৩ বছরের করুণ ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। ২৩ বছরের ইতিহাস মুমূর্ষু নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।’
জনগণের প্রবল চাপ ও প্রত্যাশা ছিল বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চে স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। বঙ্গবন্ধু যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন তখন জনমত সৃষ্টির দায়িত্ব প্রাথমিক পর্যায়ে ছাত্রলীগের ওপর দেওয়া হতো। অগ্রগামী দল হিসেবে যেমন ‘জয় বাংলা’, ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘গ্রামে গ্রামে দুর্গ গড়ো, মুক্তিবাহিনী গঠন করো,’ স্লোগান, স্বাধীনতার পতাকা, জাতীয় সংগীত প্রভৃতিও সুপরিকল্পিতভাবে ছাত্রলীগকে দিয়ে প্রথমে মাঠে ছাড়েন। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে ছাত্রলীগের তৎকালীন কজন বিশিষ্ট নেতাকে নিয়ে ১৯৬১ সালেই একটি গোপন নিউক্লিয়াস গঠন করেন। এদের মাধ্যমেই স্বাধীন বাংলাদেশ আন্দোলনের এসব উপাদান জনসমক্ষে আনা হয়। ১৯৭১-এর ৭ মার্চে নিউক্লিয়াসের তৈরি এবং স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নামে প্রচারিত ইশতেহারে বাংলাদেশের নাম, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, মুক্তিবাহিনী গঠন, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, সামরিক প্রশিক্ষণসহ যাবতীয় বিষয় প্রকাশ করা হয়। অতএব যারা বলেন, বঙ্গবন্ধু প্রস্তুতি না নিয়ে স্বাধীনতাসংগ্রাম শুরু করেছিলেন তারা হয় তা অজ্ঞতাপ্রসূতভাবে বলেন অথবা মিথ্যাচার করেন। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন, ৩ মার্চ পল্টনে ছাত্রদের ওই বিস্তৃত ইশতেহারই বঙ্গবন্ধুর সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিন্ন ভিন্ন অংশ এবং স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের পূর্ণাঙ্গ কর্মকৌশল। এ সময়ে তিনি শুধু আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-শুভানুধ্যায়ী নয়, বাম রাজনৈতিক দল কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সাথেও একটা যোগাযোগ রাখতেন। এভাবে তৃণমূল পর্যায় থেকে সর্বস্তরে তিনি তার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তারপরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতেন। ১৯৬৫ সালে বায়াফ্রার Unilateral Declaration of Independence (UDI) -এর কথা তার মনে ছিল। তাই তিনি অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাষণে বললেনÑ ‘অ্যাসেম্বলি কল করেছেন, আমার দাবি মানতে হবে। প্রথমে সামরিক আইন মার্শাল ‘ল’ ডরঃযফৎধি করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত যেতে হবে। যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে। আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখব, আমরা অ্যাসেম্বলিতে বসতে পারব কি পারব না।’
বঙ্গবন্ধুর এই ৪টি শর্তকে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিচক্ষণ রণকৌশল হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। আমাদের বিবেচনায় মাস্টার স্ট্রোকসমৃদ্ধ এই ৪টি শর্তে ৩টি উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে : এক. স্বাধীনতা ঘোষণা শোনার জন্য পাগলপারা উত্তাল জনসমুদ্র একটু থমকে গেছে, তবে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেনি। তারা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছে যে বঙ্গবন্ধু অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্যই একটি কৌশলগত ধাপ হিসেবেই এই কঠিন ৪টি শর্তকে সামনে নিয়ে এসেছেন; দুই. দৃশ্যত নেতা গণতন্ত্রসম্মত ও নিয়মতান্ত্রিক পথেই আছেন এবং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে তার এই শর্তসমূহ যৌক্তিকÑ বহির্বিশ্বকে এমন ধারণা দেওয়া। এই শর্ত দেওয়া না হলে : তার ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রামÑ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’Ñ এই বাক্যকে একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা (UDI) বলে গণ্য করা হতো। তাতে তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে অভিযুক্ত হতেন। ফলে আন্তর্জাতিক আইন ও বিশ্ব-জনমত দুইই তার বিপক্ষে চলে যেত। তাই রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা ও মেধাবী কৌশলবিদ হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েও তার কার্যকারিতাকে তিনি শর্তসাপেক্ষ করে রাখলেন; তিন. আমাদের ধারণা বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চে সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলে পাকিস্তানি শাসকচক্র ট্যাংক, মেশিনগান ও বিমান আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। এতে বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগের প্রায় সকল নেতাই নিহত হতেন। স্বাধীনতার ঘোষণার শর্তযুক্ত বার্তাবরণ পাকশাসকদের সেই পরিকল্পনা বানচাল করে দেয়। বঙ্গবন্ধুর ক্ষুরধার রাজনৈতিক কৌশলের কাছে পরাজিত হয়ে ইয়াহিয়া-ভুট্টোরা ক্রোধান্ধ বুনো শুয়োরের মতো নিজেরাই একতরফা ক্র্যাকডাউনে গিয়ে গণহত্যা শুরু করায় বঙ্গবন্ধুর চার শর্ত বাতিল হয়ে গিয়ে ২৬ মার্চ থেকে তার ঘোষণা কার্যকর হয়। ২৬ মার্চ মধ্যরাতে তার স্বাধীনতার নতুন ঘোষণাটি ছিল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।
আসলে ৪টি শর্ত দিয়ে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর ৭ মার্চের আক্রমণকে ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন। ওরা ওই দিন বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যা করে বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল। তা না হওয়ার পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিয়ে আক্রমণ করার জন্য ইয়াহিয়া-ভুট্টো আলোচনার ছলনাময় অধ্যায়টির সূত্রপাত করেন। ফলে পরিস্থিতি কী হবে তা কি বঙ্গবন্ধু জানতেন না? অবশ্যই জানতেন এবং তারও কিছু সময়ের প্রয়োজন ছিল। তাই তিনি আলোচনা চালালেন কিন্তু জানতেন এ হবে নিষ্ফলা। সেজন্যই নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুযায়ী পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী হলেও তিনি বুঝেছিলেন, পাকিস্তানি চক্রান্তকারীরা তাকে এই ক্ষমতা দেবে না। তাই তিনি ওই ঐতিহাসিক ভাষণে বলেনÑ ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দেবার চাই আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারি, আদালত, ফৌজদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।… ২৮ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন।’ এ বক্তব্যে তিনি ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এবং বলে দিয়েছেন তিনি ‘প্রধানমন্ত্রী’ অর্থাৎ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চান না। তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশে, যে জন্য কোন অফিস বন্ধ থাকবে তা যেমন বলছেন তেমনি ২৮ তারিখে কর্মচারীদের বেতন নিয়ে আসতে বলেছেন। এই বক্তব্যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা আছে। তবে তা বাস্তবায়নের জন্যই আবার বলেছেনÑ ‘তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছুইÑ আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।’ পাকিস্তানি শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এই বক্তব্য গেরিলাযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ। দিব্যচোখে ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েই যেন আবার স্মরণ দেওয়ার জন্য বললেনÑ ‘তোমাদের যা-কিছু তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।’ আবার সামনে আনলেনÑ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’

১৩ মার্চ ২০১৬

৭ মার্চের ভাষণের ওপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা ছিল: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ওপর দেশে একসময় অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণের মধ্যে ৭ মার্চের ভাষণ স্থান পেয়েছে। এই ভাষণের ওপর নিষেধাজ্ঞা ধাকায় একটি প্রজন্ম সত্য জানা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

শনিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ওপর সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। খবর: বাসস ও ইউএনবি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ মার্চের ভাষণ জাতিকে পথ দেখিয়ে গেছে। তরুণ প্রজন্মের প্রতি তিনি বারবার এ ভাষণ শুনে নিজেদের শানিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এ ভাষণের প্রত্যেকটি শব্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ভাষণ মাথা উঁচু করে চলার মনোবল দেয়। যে কোনো অবস্থা মোকাবেলা করার, শত্রুকে দমন করার পথ শেখায়। এ ভাষণের আবেদন কোনো দিন শেষ হবে না।

শেখ হাসিনা ৭ মার্চের ভাষণকে বাঙালি রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক অনন্য দলিল আখ্যায়িত করে বলেছেন, এর আবেদন কোনদিন শেষ হবে না। এই ভাষণ অক্ষয় হয়ে থাকবে। যুগ যুগ ধরে শোষিত-বঞ্চিত মানুষকে প্রেরণা ও শক্তি জোগাবে, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহস দেবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণের মধ্যে ৭ মার্চের ভাষণ স্থান পেয়েছে। অথচ এই ভাষণ বাজানোর উপরই একদিন এদেশে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা ছিল। কত দুর্ভাগ্য ছিল জাতির, যারা জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা ঐ সময় পার করেছে তারা জাতির এই অমূল্য সম্পদ সম্পর্কে জানতেও পারেনি। কারণ তখন একাত্তরের পরাজিত শক্তির পদলেহন করাই ক্ষমতাসীনদের একমাত্র কাজ ছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

প্রধানমন্ত্রী সে সময় একটি প্রজন্মকে এই ভাষণ থেকে দূরে রাখায় তাদেরকে সত্য বঞ্চিত জেনারেশন বলে আক্ষেপ প্রকাশ করে ভবিষ্যতে যেন আর কেউ সত্য বঞ্চিত না হয় সে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

তিনি তরুণ প্রজন্মকে এই ভাষণ থেকে মাথা উঁচু করে চলার প্রেরণা অর্জন করে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী জাতি হিসেবে এগিয়ে যাবার এবং পৃথিবীতে সবার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাথা উঁচু করে চলারও আহবান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আমরা আজকের অবস্থানে এসেছি। পেট্রল বোমা দিয়ে মানুষকে পুড়িয়ে মারা মানুষ খুন করা, কষ্ট দেয়া, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ-বাংলা ভাই কত বাধা, কত কিছুকে আমরা মোকাবেলা করেছি। সবকিছু মোকাবেলা করেই আজকের বাংলাদেশ সারাবিশ্বে একটা মর্যাদা পেয়েছে। এই মর্যাদা তৈরী করে নেবার যে আমরা শক্তি পেয়েছি এই শক্তি জাতির পিতাই আমাদেরকে দিয়েছেন। ৭ই মার্চের এই ভাষণই আমাদের এই পথ দেখিয়ে গেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৮১ সালে আমি দেশে ফেরার পর দেখেছি এই ভাষণ প্রচার এমনকি বঙ্গবন্ধুর নাম নেয়া বা জয়বাংলা শ্লোগান নিষিদ্ধ ছিল। ৭ মার্চের ভাষণ বাজাতে গিয়ে অনেককে জীবনও দিতে হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী সে সময়ে টেলিভিশনে একটি অনুষ্ঠান প্রচারের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘একটি বই ধরে কিছু উদ্বৃত করা হচ্ছিল, বইয়ে অনেকগুলো ছবির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছবিও থাকায় সেটি যেন পর্দায় দেখতে না পাওয়া যায় তাই আঙুল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল।

তিনি বলেন, ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতির অহংকার ছিল। আর বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর সেই অহংকার থেকেই আমাদের দূরে সরিয়ে রাখার অপচেষ্টা করা হয়।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু যে বলেছিলেন আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না..তাই দাবায়ে রাখতে পারেনি। এই ভাষণ আবারও ফিরে এসেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী ৭ মার্চের ভাষণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেছেন কিন্তুু এই রাজনীতির পেছনে তাঁর মা, বাবা বিশেষ করে আমার মাকে আজীবন পাশে পেয়েছেন, প্রেরণা পেয়েছেন এখন সৌভাগ্য অনেক কম মানুষেরই হয়।

বঙ্গবন্ধু মেমেরিয়াল ট্রাস্টের সভাপতি বলেন, পরিবারের বড় সন্তানের ওপর অনেক দায়িত্ব থাকলেও বঙ্গবন্ধু তাঁর মা-বাবার কাছে মৃত্যুর আগ পর্যন্তই ছোট্ট খোকাটিই ছিলেন। খোকা যেভাবে চলেছে, যা চেয়েছে তাতে তাঁরা কোন বাধা দেননি, এই যে মনের একটা সাহস ও শক্তি পেয়েছিলেন তিনি পরিবারের কাছ থেকে, তা অসাধারণ, জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, আমার মা প্রতিটি কাজে যেভাবে আমার বাবার পাশে থেকেছেন। সংসারের সকল দায় থেকে তাঁকে মুক্ত করেছেন-বলেছেন ভাবতে হবে না। তিনি নিজেই দায়িত্ব নিয়েছেন। আমাদেরকে মানুষ করা লেখাপড়া শেখানো থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে যত মামলা সে সব তদারকি করা উকিলের বাসায় দৌড়ানো তার কাগজপত্র তৈরী করা কোর্টে যাওয়া-সবই তিনি একাই সামলেছেন। আমি দেখিনি তাঁকে হতাশ হতে। আমিতো বড় সন্তান হিসেবে নিজেই এই ঘটনার সবচেয়ে বড়ো সাক্ষী।

সেমিনারে মূল নিবন্ধ উপস্থাপন করেন সাংবাদিক-কলাম লেখক আবুল মোমেন। আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এম মশিউর রহমান ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার।

যুগ যুগ শোষিত-বঞ্চিতদের সাহস দেবে সাতই মার্চ: প্রধানমন্ত্রী

বঙ্গবন্ধু সাতই মার্চের ভাষণের মধ্যে দিয়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে যেভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তা ইতিহাসে বিরল ঘটনা বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শনিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ‘কালোত্তীর্ণ ভাষণ: প্রস্তুতি ও প্রভাব’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, “একটি ভাষণের মধ্য দিয়ে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনায় তিনি উদ্বুদ্ধ করে নিয়ে এলেন। এমন ঘটনা ইতিহাসে বিরল। আর সেই পথ ধরেই কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা অর্জন।”

শেখ হাসিনা বলেন, “এই ভাষণকে যতভাবেই বিশ্লেষণ করা যাক, প্রতিনিয়তই যেন নতুনভাবে আমাদের সামনে চলে আসছে।

“৪৬ বছর ধরে একটি ভাষণ এখনও মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। এর আবেদন কখনও শেষ হয় না।”

বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট আয়োজিত আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।

পাকিস্তান আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “প্রথমে পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য, সেই মুসলিগ লীগ গঠন করা, পাকিস্তান সৃষ্টি করা। পাকিস্তান হওয়ার সাথে সাথে তিনি বুঝলেন, এই ১২০০ মাইলের ব্যবধানে এবং যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি, আচার-আচরণে মিল নেই, তাদের সাথে এক হয়ে চলা বা এক হয়ে থাকা এটা অসম্ভব।

“বাঙালিকে আলাদা জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, আলাদা রাষ্ট্র দেওয়া এই স্বপ্নটাই ছিল জাতির পিতার।”

সাতই মার্চের ভাষণের পেছনের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, “অনেকে বক্তৃতার পয়েন্ট লিখে ফেললেন, হাতে দিয়ে গেলেন। অনেকে এসে বললেন, আজকে এটা বলতেই হবে, না হলে মানুষ হতাশ হয়ে ফিরে যাবে। আজকে সেইদিন, এদিন না বললে আর বলা যাবে না।

“আমরা মা একথাটাই বলেছিলেন যে, অনেকে অনেক কথা বলবে। এই মানুষের জন্য সারাজীবন তুমি কষ্ট স্বীকার করেছ। তুমিই জানো কী বলতে হবে, তুমি জানো কী করতে হবে। অনেকে অনেক কিছু বলবে, কারও কথা শোনার কোনো প্রয়োজন নাই।”

শেখ হাসিনা বলেন, “উনি (বঙ্গবন্ধু) যে ভাষণ দিয়েছেন, উনার হাতে কিন্তু কিছু নেই। উনি সোজা দাঁড়ালেন। জনতার সামনে গেলেন। যা বলার বলে দিলেন।”
লাখ লাখ মানুষকে স্বাধীনতার জন্য, মুক্তিযুদ্ধের জন্য, গেরিলাযুদ্ধের জন্য ‘সবরকম প্রস্তুতি-নির্দেশনা’ ওই ভাষণে দেওয়া হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।

“কী কী করতে হবে প্রত্যেকটা কথা কিন্তু তিনি বলে দিলেন। দিক নির্দেশনা দিয়ে দিলেন। এমনভাবে তিনি বললেন, মানুষ কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে যার যার জায়গায় চলে গেল।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাঙালির স্বাধীন সত্ত্বা ও আত্মপরিচয়ের পথটা বঙ্গবন্ধু দেখিয়ে দিয়েছিলেন।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর এই ভাষণ প্রচারে অলিখিত নিষেধাজ্ঞার থাকার কথাও অনুষ্ঠানে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা।

সেই সময় থেকে ‘ইতিহাস বিকৃতি’ ও বঙ্গবন্ধুর ‘নাম মুছে ফেলার’ নানা প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “একটা প্রজন্ম তো জানতেই পারেনি কীভাবে একটা দেশ স্বাধীন হলো। আমরা যুদ্ধ করে বিজয়ী জাতি- সেই গর্ব করার জায়গাটাই যেন হারিয়ে গিয়েছিল।”

তবে এসব অপপ্রয়াস সফল হয়নি মন্তব্য করে বঙ্গবন্ধুর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “কিন্তু বাঙালিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি।”

“আমি আশাবাদী এখন যে, আজকে মানুষের ভেতরে অনেক পরিবর্তন এসেছে।

বিশেষ করে আমাদের নতুন প্রজন্ম..,” বলেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, “সাতই মার্চের ভাষণটাই কিন্তু আমাদের প্রেরণা। সাতই মার্চের ভাষণইতো আমাদেরকে পথ দেখিয়ে গেছে। এই সাতই মার্চের প্রত্যেকটি শব্দ আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

“সাতই মার্চের ভাষণটা আমাদের সেই চেতনাটা এনে দেয়। মাথা উঁচু করে চলার মনোবল আমাদের দেয় এবং যে কোনো অবস্থা মোকাবিলা করার, শত্রুকে দমন করার পথ দেখায়।”

শেখ হাসিনা বলেন, “পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণের মধ্যে এই ভাষণ স্থান পেয়েছে; অথচ এই বাংলাদেশেই একদিন এই ভাষণের ওপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা ছিল যে, এই ভাষণ বাজানো যাবে না, শোনা যাবে না।”

এজন্য একটা প্রজন্ম এই ভাষণ থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে মনে করেন শেখ হাসিনা।

তবে ভবিষ্যতে সেই বঞ্চনার ‘বোঝা’ বাঙালি জাতিকে ‘বইতে’ হবে না- এমন আশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আর কেউ ভবিষ্যতে দাবায়ে রাখতে পারবে না। এই ভাষণ যুগ যুগ ধরে শোষিত, বঞ্চিত মানুষদেরকে প্রেরণা দেবে, শক্তি যোগাবে, সাহস যোগাবে।
“আমি আশা করি, আমাদের যুব সমাজ, বিশেষ করে আজকে যারা ছাত্র, তরুণ; আগামী দিনে যারা এই দেশের কর্ণধার হবে, তারা এই ভাষণটাকে আরও বারবার শুনবে, প্রেরণা পাবে, নিজেদেরকে তৈরি করবে, যে কোনো অবস্থা মোকাবিলা করবার মতো শক্তি, সাহস নিয়ে তারা এ দেশকে গড়ে তুলবে।”

শেখ হাসিনা বলেন, সন্ত্রাস, মৌলবাদ, আগুন দিয়ে পোড়ানোসহ নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও তার নেতৃত্বাধীন সরকার দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

আলোচনা অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক ও সাংবাদিক আবুল মোমেন।

তিনি বলেন, “বাংলার লোকগান শুনে তাতে রস না পেলে যেমন বাঙালি হওয়া যায় না, তেমনি সাতই মার্চের ভাষণ শুনে অনুপ্রাণিত বোধ না করলে সেও মনে হয় খাঁটি বাঙালি হতে পারবে না।”

শহীদ মিনার ও সৃতিসৌধের মতোই সাতই মার্চের ভাষণও অফুরন্ত প্রেরণার উৎস বলে মনে করেন আবুল মোমেন।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন নাট্য সংগঠক রামেন্দু মজুমদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক মশিউর রহমান ও বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সদস্য সচিব শেখ হাফিজুর রহমান।

৩০ অক্টোবর ২০১৭

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’

একাত্তরের ৭ মার্চ যে ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন, সেই ভাষণ ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে ইউনেস্কোর মেমোরি অফ দা ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে যুক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।

মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইউনেস্কো মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা সোমবার প্যারিসে এই জাতিসংঘ সংস্থার কার্যালয়ে ওই সিদ্ধান্তের কথা জানান।

৪৬ বছর আগে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) স্বাধীনতাকামী ৭ কোটি মানুষকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

তার ওই ভাষণের ১৮ দিন পর পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি নিধনে নামলে বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। নয় মাসের সেই সশস্ত্র সংগ্রামের পর আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

ইউনেস্কো জানিয়েছে, তাদের মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড (এমওডব্লিউ) কর্মসূচির ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটি গত ২৪ থেকে ২৭ অক্টোবর প্যারিসে দ্বিবার্ষিক বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণসহ মোট ৭৮টি দলিলকে ‘ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ হিসেবে ‘মেমোরি অফ দা ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ যুক্ত করার সুপারিশ দেয়।

এরপর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা ওই সুপারিশে সম্মতি দিয়ে বিষয়টি ইউনেস্কোর নির্বাহী পরিষদে পাঠিয়ে দেন এবং সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে সেই তথ্য প্রকাশ করেন।

নিয়ম অনুযায়ী, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটির সুপারিশে মহাপরিচালকের সম্মতি পেলেই কোনো দলিলকে ওই তালিকায় যুক্ত করে নেওয়া হয় এবং পরে তা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

রেসকোর্সে সেদিন

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা সেদিন ছিল মিছিলের শহর। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে মানুষ পায়ে হেঁটে, বাস-লঞ্চে কিংবা ট্রেনে চেপে রেসকোর্স ময়দানে সমবেত হয়েছিলেন।

ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে লাখ লাখ মানুষে সয়লাব হয়ে গিয়েছিল বিশাল ময়দান। মুহুর্মুহু গর্জনে ফেটে পড়েছিলেন উত্থিত বাঁশের লাঠি হাতে সমবেত লাখ লাখ বিক্ষুব্ধ মানুষ। বাতাসে উড়ছিল বাংলার মানচিত্র আঁকা লাল সূর্যের অসংখ্য পতাকা।

বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি আর হাতাকাটা কালো কোট পরে বাঙালির প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধু সেদিন দৃপ্তপায়ে উঠে আসেন রেসকোর্সের মঞ্চে। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে আকাশ-কাঁপানো স্লোগান আর মুহুর্মুহু করতালির মধ্যে হাত নেড়ে অভিনন্দন জানান অপেক্ষমান জনসমুদ্রের উদ্দেশে।

তারপর শুরু হয় সেই ঐতিহাসিক ভাষণ।

তিনি বলে চলেন- “… আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু, আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে।”

বঙ্গবন্ধু বলেন, “…সৈন্যরা, তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবে না।”

উত্তাল জনসমুদ্র যখন স্বাধীনতার ঘোষণা শুনতে উদগ্রীব, তখন এরপর বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেন তার চূড়ান্ত আদেশ- “তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব- এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।”

মাত্র ১৯ মিনিটের সেই ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে তুলে দেন অবিশ্বাস্য এক উচ্চতায়। এতে সামরিক আইন প্রত্যাহার, সৈন্যবাহিনীর ব্যারাকে প্রত্যাবর্তন, শহীদদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের চার দফা দাবি উত্থাপন করেন তিনি।

রেসকোর্স ময়দান থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সরাসরি প্রচারের সব আয়োজন ছিল ঢাকা বেতার কর্তৃপক্ষের। প্রচার শুরুও হয়েছিল। কিন্তু সামরিক কর্তৃপক্ষ প্রচার বন্ধ করে দিলে বেতারের সব বাঙালি কর্মচারী বেতার ভবন ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। বন্ধ হয়ে যায় সব ধরনের সম্প্রচার কার্যক্রম।

ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে নানা গুজব। গভীর রাতে অবশ্য সামরিক কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুর পূর্ণ ভাষণ সম্প্রচারের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়।

Advertisements
2 Comments
  1. ৭ মার্চই স্বাধীনতার ঘোষণার চাপ কেন ছিল, প্রশ্ন হাসিনার

    একাত্তরের সাতই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণের দিনেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে দলের ভেতর থেকে ‘কারা, কী উদ্দেশ্যে’ চাপ দিচ্ছিল, তা খুঁজে দেখার কথা বলেছেন তার মেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

    সেদিন সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে আন্তর্জাতিকভাবে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারত- এমন ইংগিত করে তিনি বলেছেন, “তাহলে, তারা (যারা চাপ দিচ্ছিল) কার হয়ে কথা বলছিল? উদ্দেশ্যটা কী ছিল?”

    সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের ওপর শুক্রবার ঢাকায় এক সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য আসে।

    তিনি বলেন, “আক্রমণকারী কারা হবে? যারা আক্রমণকারী হবে, আন্তর্জাতিকভাবে তারাই হবে অপরাধী। আর কোনোমতেই বিচ্ছিন্নতাবাদী হওয়া যাবে না। তাহলে কখনো কোনো উদ্দেশ্য সফল হয় না।”

    তেইশ বছরের শোষণ-বঞ্চনার অবসানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিস্মরণীয় সেই ভাষণের পর মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেছিল বাঙালি জাতি। এ কারণে ৭ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময় একটি দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
    ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে লাখো জনতার সেই সমাবেশে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব- এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।”

    সেই ভাষণের পর ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী শুরু করে নৃশংস গণহত্যা। আর ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।

    জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট আয়োজিত সেমিনারে সাড়ে চার দশক আগের সেই স্মৃতি স্মরণ করতে গিয়ে শেখ হাসিনা তার ভাষায় কিছু ‘রুঢ়’ কথা বলেন।

    বঙ্গবন্ধুর বড় সন্তান শেখ হাসিনা সেদিন তার বাবার গাড়িবহরের সঙ্গেই তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা।

    জনসভা শেষে তাদের গাড়ি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হয়ে ফুলার রোড দিয়ে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে ফেরে। পথে রেসকোর্স ময়দান থেকে বাঁশের লাঠি হাতে স্লোগান মুখর স্বতঃস্ফূর্ত জনতাকে ফিরতে দেখার কথা সেমিনারে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

    বাড়ি ফিরে শেখ হাসিনা যা দেখেছিলেন; সেই ঘটনা তিনি তুলে ধরেন তার বক্তব্যে।

    “আমি যখন ঘরের মধ্যে ঢুকলাম, ঠিক সেই সময় দেখি, আমাদের কয়েকজন ছাত্রনেতাসহ বেশ কিছু … তারা হঠাৎ দেখি বেশ উত্তেজিত। আমার আব্বাকে বলছেন, ‘এটা কী হল লিডার? আপনি স্বাধীনতার ঘোষণাটা দিয়ে আসলেন না। মানুষ সব হতাশ হয়ে ফিরে গেল’।

    “ঠিক এই কথাটা যখন বলছে, তখনই আমি ভেতরে ঢুকেছি। ঢুকে সাথে সাথে আমি বললাম, আপনারা মিথ্যা কথা বলছেন কেন? আমি একটু টাশ টাশ মুখের ওপর কথা বলে দেই; এটা আমার অভ্যাস।

    “আমি বললাম, আপনারা এই রকম মিথ্যা কথা বলেন কেন? মানুষ কোথায় হতাশ হয়ে গেছে? তাহলে আপনারা মানুষ দেখেন নাই। আমি কিন্তু মানুষ দেখতে দেখতে আসলাম। মানুষের ভেতরে যে উৎসাহ উদ্দীপনা আমি দেখলাম, তাতে আমি তো কারও মুখে কোনো হতাশা দেখলাম না। আপনারা কেন আব্বাকে এরকম মিথ্যা কথা বলেন। আব্বাকে এরকম মিথ্যা কথা বলবেন না।”

    শেখ হাসিনা বলেন, সেদিন যাদের তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে চাপাচাপি করতে দেখেছিলেন, তাদের কথায় কান না দিতে বলেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে।
    “আমি আব্বাকে সোজা বললাম, আব্বা আপনি ওদের কথা বিশ্বাস করবেন না। কারণ সবাই মিথ্যা কথা বলছে। মানুষ কিন্তু সাংঘাতিক উজ্জীবিত হয়ে যাচ্ছে। সবাই স্লোগান দিতে দিতে হলে যাচ্ছে।”

    সেদিন ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’, ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’ স্লোগান দিতে দিতে জনতার পথচলা দেখার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “সেই সময়কার সমস্ত স্লোগান দিতে দিতে মানুষ এগিয়ে যাচ্ছিল।”

    শেখ হাসিনা বলেন, সেদিন যাদের তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে কথা বলতে দেখেছিলেন, তাদের কেউ কেউ পরে আওয়ামী লীগ ছেড়ে চলে গেছেন। কেউ কেউ গিয়ে আবার ফিরেও এসেছেন।

    “এরকমও কেউ ছিল… অনেকে চলে গিয়ে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র থেকে অনেক কিছু করতে চেষ্টা করেছে।”

    স্বাধীনতার পর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগ ছেড়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠনে ছিলেন এক সময়ের ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খান এবং ১৯৭১ সালে ডাকসুর ভিপি আ স ম আবদুর রব ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ।

    ছাত্রলীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়ে বাকশাল গঠন করে পরে আবার দলে ফেরেন।

    শেখ হাসিনা বলেন, “আমি মাঝে মাঝে চিন্তা করি, তারা ওই কথাটা তখন কেন বলেছিল? এটাও একটু চিন্তা ও বিশ্লেষণের দরকার আছে। কারণ আমি তো অনেক কিছুর সাক্ষী ওই বাড়িতে থেকে।”

    কোথায় কোন পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে, কীভাবে যুদ্ধ হবে বা কীভাবে দেশের মুক্তি আসবে- তার সব কিছু বঙ্গবন্ধুই জানতেন বলে সেমিনারে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।তার বক্তৃতায় ২৫ মার্চের কালরাতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যাওয়ার কথাও আসে।

    “২৫শে মার্চ যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাজারবাগ আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, তার আগেই আমাদের কাছে একটা খবর আসল। স্বাধীতার বাণীটা আগেই প্রস্তুত করা ছিল।”

    সেদিন ৩২ নম্বরে বাসার লাইব্রেরির পাশে বারান্দায় যাওয়ার দরজার পাশে রাখা টেবিলে টেলিফোন থেকে ইপিআরে ফোন করে বঙ্গবন্ধুর বার্তা দেওয়ার কথাও স্মরণ করেন শেখ হাসিনা।

    “ওই টেলিফোনে তিনি ম্যাসেজটা ইপিআর ফাঁড়িতে দিয়ে দেন। ওখানে শওকত সাহেবসহ (শহীদ সুবেদার মেজর শওকত আলী) চারজন বসেছিলেন। তারা অপেক্ষায় ছিলেন। যখনই আক্রমণ করবে এই ম্যাসেজটা তারা পৌঁছে দেবে সমস্তা জায়গায়… ওয়্যারলেস, টেলিগ্রাম, টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমে সমস্ত বাংলাদেশে তা পৌঁছে যাবে।”

    বাঙালির সংগ্রামের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু সত্তরের নির্বাচনের মাধ্যমে সেই ঘোষণা দেওয়ার ‘ম্যান্ডেট’ নিয়ে নিয়েছিলেন বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।
    “তিনি জনমত নিয়ে নিয়েছিলেন। ওই নির্বাচন করার আগে যারা নির্বাচনে বাধা দিতেন, একটা কথাই তাদের তিনি বলতেন- ‘বাংলাদেশের নেতা কে, এটা জনগণই সিদ্ধান্ত নিয়ে দিক। জনগণই বলে দিক।’ জনগণের যে ম্যান্ডেট, জনগণের যে মতামত, জনগণের যে অনুমোদন; তার একান্ত প্রয়োজন ছিল।”

    বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, “জনগণের ম্যান্ডেটটা একমাত্র ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। স্বাধীনতার ঘোষণা কেবল তিনিই দিতে পারেন। সে অধিকার তারই ছিল।

    “তার প্রত্যেকটা পদক্ষেপ অত্যন্ত সুচিন্তিত ছিল বলেই আমরা যুদ্ধ করে দেশের বিজয় অর্জন করতে পেরেছিলাম।”

    শেখ হাসিনা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত প্রস্তুতি বঙ্গবন্ধু ‘আগেই নিয়ে রেখেছিলেন’।

    “তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হলে যুদ্ধ যে চলতে থাকবে, সেটা তিনি জানতেন। ধরেই নিয়েছিলেন, তাকে মেরে ফেলে দেবে। তার অবর্তমানে সব কিছু যেন চলে, তিনি সে ব্যবস্থাও করে রেখে গিয়েছিলেন।”

    প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আমাদের অন্তরে অক্ষয়। তিনি বাঙালির হৃদয়ে চিরদিন থাকবেন।”

    ‘বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ: রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামো পরিবর্তনের দিকদর্শন’ শীর্ষক এই সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান।

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিনাত হুদা এবং সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এ আরাফাত প্রবন্ধের ওপর আলোচনায় অংশ নেন।

    এছাড়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাশুরা হোসেন সেমিনারে বক্তব্য দেন।

    http://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article1301170.bdnews

    //platform.twitter.com/widgets.js

  2. ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি বিশাল গৌরবের: প্রধানমন্ত্রী
    https://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article1415413.bdnews

    একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণ ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে ইউনেস্কোর ‘মেমোরি অফ দা ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ যুক্ত হওয়ায় ‘গভীর সন্তোষ’ প্রকাশ করেছেন তার কন্যা বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

    বুধবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, “ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি বাঙালি জাতি এবং বাংলা ভাষার জন্য বিশাল গৌরবের।”

    ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর সামরিক শাসনামলে এবং বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে জাতির পিতার ওই ভাষণ গণমাধ্যমে প্রচার নিষিদ্ধ থাকলেও বঙ্গবন্ধুর সেই কণ্ঠ “সাধারণ মানুষের হৃদয় থেকে কোনদিনই মুছে যায়নি।”

    ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের অংশ ঘোষণা করায় ইউনেস্কো এবং এর মহাসচিব ইরিনা বোকোভাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।

    ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৪৬ বছর আগে সেই ভাষণে স্বাধীনতাকামী ৭ কোটি বাঙালিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

    তার ওই ভাষণের ১৮ দিন পর পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি নিধনে নামলে বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। নয় মাসের সেই সশস্ত্র সংগ্রামের পর আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

    বিভিন্ন দেশের আরও ৭৭টি ঐতিহাসিক নথি ও প্রামাণ্য দলিলের সঙ্গে এবার বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণকেও ‘ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ হিসেবে ‘মেমোরি অফ দা ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ যুক্ত করে নিয়েছে ইউনেস্কো।

    ইরিনা বোকোভা সোমবার প্যারিসে ইউনেস্কো কার্যালয়ে ওই সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ করার পর বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বিবৃতি দেন বলে তার প্রেস সচিব ইহসানুল করিম এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান।

    স্বাধীনতার জন্য বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস এবং জাতির পিতার ৭ মার্চের ভাষণের ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বিবৃতিতে বলেন, “আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষণ। এ ভাষণ বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করেছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিজয় ছিনিয়ে আনতে।”

    আড়াই হাজার বছরের গণজাগরণ ও উদ্দীপনামূলক বিশ্বসেরা ভাষণ নিয়ে ইতিহাসবিদ জ্যাকব এফ ফিল্ডের লেখা ‘উই শ্যাল ফাইট অন দা বিচেস: দি স্পিচেস দ্যাট ইনস্পায়ার্ড হিস্ট্রি’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ স্থান পেয়েছে। বিশ্বের ১২টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে অনুপ্রেরণাদায়ী ওই ভাষণ।

    এর ধারাবাহিকতায় ইউনেস্কোর স্বীকৃতিকে ‘আরেকটি মাইলফলক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন শেখ হাসিনা।

    বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণই ছিল প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: